
দিনকয়েক আগেই প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন মোহন যাদব। আর তারপরই নাকি একটি চরম সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপ করেছেন তিনি। সম্প্রতি বেশ কিছু ফটোকার্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে। যেখানে দাবি করা হচ্ছে, মধ্যপ্রদেশের নতুন মুখ্যমন্ত্রী নাকি ঘোষণা করেছেন যে মসজিদে লাউডস্পিকার বাজানো যাবে না।
এই গ্রাফিক্স কার্ডটিতে লেখা রয়েছে, "বাজানো যাবেনা মসজিদে লাউড্স্পীকার, ঘোষণা মধ্যপ্রদেশের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর। মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেই বড়সড় সিদ্ধান্ত নিলেন মধ্যপ্রদেশের নতুন মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব। নিষিদ্ধ করলেন মসজিদ থেকে লাউস্পীকার বাজানো। নতুন নির্দেশিকা সাজিয়েছেন এ বিষয়ে। বহির্ভূতভাবে ভাবে লাউডস্পিকার বাজালে সেটা নিষিদ্ধ করতে হবে। নির্দিষ্ট ডেসিবেলের মধ্যে বাজাতেই হবে মসজিদের লাউড স্পিকার। বিজেপি হাইকমান্ডের নির্দেশেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মোহন যাদবের, বাড়ছে জল্পনা। যা খুশি তাই করে যাচ্ছে বিজেপি !!"
এই গ্রাফিক্স কার্ডের তথ্য থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে এটি একটি সম্প্রদায়ের বিরোধী সিদ্ধান্ত ও একটি মাত্র সম্প্রদায়ের ভাগাবেগে আঘাত দিতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোহন যাদব সরকার।
তবে ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে এই নিয়ম শুধু মসজিদ নয়, বরং সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য বলবৎ করা হয়েছে।
কীভাবে জানা গেল সত্যি
সবার প্রথম আমরা কিওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি যে মধ্যপ্রদেশের নতুন মুখ্যমন্ত্রী ঠিক কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সার্চের দরুন আমাদের টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন আমরা পাই যেখানে গত ১৩ ডিসেম্বর এই সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল।
সেই প্রতিবেদনে কোথাও লেখা হয়নি যে শুধু মসজিদের লাউডস্পিকারের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বরং সেখানে উল্লেখ করা হয় হয় যে কোনও রকম পাবলিক প্লেসে অনুমোদন ছাড়া কোনও ধর্মীয় স্থান বা ডিজে-ও মাত্রাতিরিক্ত আওয়াজে লাউডস্পিকার বাজারে পারবে না। মূলত শব্দদূষণের পরিমাণ কমাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে লেখা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে এই সম্পর্কিত ঠিক কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা বিশদে ও তার খুঁটিনাটি জানতে আমরা সরকারি নির্দেশনামা বা অর্ডার কপিটি খতিয়ে দেখি। পাঁচ পাতার এই অর্ডার কপিতে এমন কথা কোথাও লেখা হয়নি যে শুধু মসজিদের লাউডস্পিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রথমত, নির্দেশনামার বিষয়বস্তুতেই লেখা রয়েছে যে এই আদেশ সম্প্রদায়ভেদে সমস্ত ধর্মীয় স্থলের জন্য প্রযোজ্য। সেই সঙ্গে শব্দদূষণ আইন, সুপ্রিম কোর্টের ২০০৫ সালের একটি নির্দেশ ও মধ্য প্রদেশ হাইকোর্টের ২০১৫ সালের নির্দেশ অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আদেশের দ্বিতীয় পাতায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে শব্দদূষণের আইন অনুযায়ী কোন কোন এলাকায় শব্দের মাত্রা কতটা রাখতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, আওয়াজের মাত্রা কোনও শিল্পতালুকে দিনের বেলা ৭৫ ও রাতের বেলা ৭০ ডেসিবলের মধ্যে রাখতে হবে। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ও রাতে শব্দের মাত্রা হবে যথাক্রমে ৬৫ ও ৫৫ ডেসিবল। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় দিনে ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবলের মধ্যে রাখতে হবে শব্দের মাত্রা। এবং নিস্তব্ধ এলাকায় দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবলের বেশি আওয়াজে মাইক বাজানো যাবে না। গত ১৩ ডিসেম্বর এই আদেশ জারি করেছে মধ্যপ্রদেশ সরকার।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই শুধু মসজিদ নয়, মন্দির থেকেও একে একে লাউডস্পিকার নামানো শুরু হয়েছে মধ্য প্রদেশে। এই সংক্রান্ত রিপোর্ট এখানে ও এখানে পড়া যাবে। জনসাধারণ এই সিদ্ধান্তকে সাদরে গ্রহণ করেছেন বলেও এই রিপোর্টগুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, পোস্টকার্ডে যে মসজিদে লাউডস্পিকার নিষিদ্ধ বলে দাবি করা হয়েছে তা সত্যি নয়। বিভ্রান্তিকর দাবিতে এই পোস্ট শেয়ার করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রদেশের নতুন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে মসজিদে লাউডস্পিকার বাজানো যাবে না।
মধ্যপ্রদেশে নতুন এই আদেশ শুধু মসজিদ নয়। মন্দির ও সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপর বলবৎ করা হয়েছে যেখানে শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বলা হয়েছে।