
মধ্যপ্রাচ্যে চলছে ইরান-ইজরায়েল সংঘর্ষ। আর এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে ইরানের তরফে ইজরায়েলে এবং আমেরিকার তেলবাহী জাহাজে হামলা সংক্রান্ত তথাকথিত একটি ছবি ও তিনটি ভিডিও। কিন্তু আমরা আমাদের অনুসন্ধানে দেখেছি যে এই ছবি এবং ভিডিওগুলির সঙ্গে ইরান-ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের কোনও সম্পর্ক নেই। এই প্রতিবেদনে আমরা ভিডিওগুলির সত্যতা যাচাই করব।
আমেরিকার নয়, ইতালির জাহাজ
ভাইরাল ছবিতে একটি জাহাজে আগুন জ্বলতে এবং সেটি থেকে ধোঁয়ার কালো কুণ্ডলী বেরিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি, জাহাজটির একাংশ জলের নীচে ডুবে রয়েছে। ছবিটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, সেটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে একটি মার্কিন তেলবাহী জাহাজ ডুবে যাওয়ার দৃশ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ছবিটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আলহামদুলিল্লাহ,, এটা প্রতিশোধের আগুন ! আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ একটি তেলবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে ইরান !”
তবে ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেকের তরফে ভাইরাল ক্লিপ এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন বিশ্বের অন্যতাম বৃহত্তম স্টক ছবির সংস্থা Alamy-র অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এই একই ছবি পাওয়া যায়। ছবির ক্যাপশন এবং বিস্তারিত অংশে প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায়, সেটি ১৯৯১ সালের ১১ এপ্রিল ইতালির জেনোয়া উপকূলের অদূরে দুর্ঘটনার জেরে ইতালির তেলবাহী জাহাজ ‘হ্যাভেন’এ আগুন ধরে যাওয়ার দৃশ্য।
তেল আভিভ নয়, এথেন্স
অন্যদিকে ভাইরাল তিনটি ভিডিও ক্লিপের মধ্যে প্রথম ক্লিপটিতে কোনও একটি স্থানে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। আর জল দিয়ে সেই আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন কয়েকজন দমকলকর্মী। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের মিসাইল হামলার জেরে দাউদাউ করে জ্বলছে ইজরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর তেল আভিভ। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ইরানের মিসাইল হামলায় নরকের আগুনের মতো জ্বলছে ইসরায়েল শহর তেল আবিব!”
তবে আজতক ফ্যাক্ট চেকের তরফে ভাইরাল ক্লিপ এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জার্মান ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং স্বেচ্ছাসেবক অগ্নিনির্বাপক কর্মী ইয়ান ওহম্যান (Jan Ohmen)-এর অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্টে ইয়ান ভিডিওটিকে ২০২৩ সালের গ্রীসের এথেন্সের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, ইয়ানের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলটি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে ২০২৩ সালের ২৬ অগস্ট মোট দশটি ছবি-সহ গ্রিসের ভয়াবহ দাবানল সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্টের চতুর্থ ছবির সঙ্গে ভাইরাল ভিডিও-র ফ্রেমের হুবহু মিল পাওয়া যায়। যা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় ভাইরাল ভিডিওটি ওই একই অগ্নিকাণ্ডের। এখানে উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে গ্রিস তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের মুখোমুখি হয়েছিল। উত্তর-পূর্ব গ্রিসের এভ্রোস অঞ্চলে লাগা এই আগুন ২০০০ সালের পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতিহাসে রেকর্ড করা বৃহত্তম দাবানল হিসেবে চিহ্নিত হয়। ইয়ান তাঁর পোস্ট সেই তথ্যই উল্লেখ করেন এবং ২০২৩ সালের ২১ অগস্ট সেই দাবানলের মূহুর্তে তোলা দশটি ছবি সেখানে শেয়ার করেন।
ইজরায়েল নয়, নিউ ইয়র্ক
ভাইরাল দ্বিতীয় ক্লিপটিতে কোনও একটি বরফে ঢাকা এলাকায় একটি বাড়িতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাড়িটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন দমকল কর্মী। এই ভিডিওটিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের মিসাইল হামলার জেরে দাউদাউ করে জ্বলছে ইজরায়েল। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ইরানের মিসাইল হামলায় ইসরায়েল নরকে পরিনত হয়েছে।”
তবে ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেকের তরফে ভাইরাল ক্লিপ এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডের নর্থ মেরিক অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “আজ ভোরে NMFD-কে একাধিক বাড়িতে আগুন লাগার ঘটনাস্থলে একটি পারস্পরিক সহায়তা ইঞ্জিন পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছিল।” পাশাপাশি, পোস্টে লং আইল্যান্ডের বেলমোর ফায়ার ডিপার্টমেন্টকে ট্যাগ করা হয়।
পাশাপাশি, ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি নর্থ মেরিক অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে এই অগ্নিকাণ্ড সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত পোস্ট পাওয়া যায়। সেখানে এই অগ্নিকাণ্ড অন্য একটি ভিডিও শেয়ার করে নর্থ মেরিক অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের তরফে উল্লেখ করা হয়েছে, একাধিক অগ্নিদগ্ধ বাড়ির আগুন নেভানোর জন্য গত ১১ ফেব্রুয়ারি বেলমোর ফায়ার ডিপার্টমেন্টের তরফে নর্থ মেরিক অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের কাছে একাধিক সহায়ক ইঞ্জিন চাওয়া হয়। সেই অনুরোধের পরেই ঘটনাস্থলে কর্মীরা পৌঁছায়। তবে সেই পোস্টে কোথাও কোনও স্থানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে ঘটনাস্থল সম্পর্কে জানতে এরপর আমরা বেলমোর ফায়ার ডিপার্টমেন্টের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজটি খতিয়ে দেখি। তখন ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সেখানে এই সংক্রান্ত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্ট থেকে জানা যায়, অগ্নিকাণ্ডটি ঘটেছিল বেলমোরের চ্যাপম্যান অ্যাভিনিউতে।
ব্রাজিলের আগ্নিকাণ্ড
ভাইরাল তৃতীয় ক্লিপটিতে কোনও একটি গাড়ির পার্কিং জাতীয় স্থানে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। আর সেই আগুনের ভিতর থেকে কোলে করে একটি কুকুর নিয়ে বেরিয়ে আসছেন একজন দমকল কর্মী। এই ভিডিওটিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের মিসাইল হামলায় দাউদাউ করে জ্বলছে ইজরায়েলের তেল আভিভ। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “জ্বলছে তেল আবিব।”
ভাইরাল ক্লিপটির সত্যতা জানতে সেটির একাধিক কি-ফ্রেম নিয়ে গুগুল লেন্সে অনুসন্ধান চালালে ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম Super Canal-এর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ভিডিওটি ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্রাজিলের পোউসো আলেগ্রে শহরের। ওইদিন সেখানে একটি অগ্নিদগ্ধ গুদামে ডায়ানা নামের একটি পিটবুল কুকুর আটকে পড়ে। তাকে উদ্ধার করতে অভিযান চালান দমকলকর্মীরা। এই একই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে অপর এক ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম RECORD EUROPA-র প্রতিবেদনেও।
এর থেকে প্রামাণ হয় যে, ইজরায়েলের উপরে ইরানের মিসাইল হামলার দৃশ্য দাবি করে ছড়ানো হচ্ছে অসম্পর্কিত সব অগ্নিকাণ্ডের ভিডিও।
ভিডিওগুলিতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের মিসাইল হামলার জেরে দাউদাউ করে জ্বলছে ইজরায়েল।
এই ভিডিওগুলির সঙ্গে ইরান-ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের কোনও সম্পর্ক নেই।