
ইজরায়েল ও মার্কিন যৌথ বাহিনীর হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তাঁর মৃত্যুর পরেই ফের একবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। খামেনেইয়ের হত্যার বদলা নিতে ইজরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক মার্কিন সেনা ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে তেহরান।
আর এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে ইরানের তরফে ইজরায়েলের উপরে হামলার এবং দুবাইতে আমেরিকার বিরুদ্ধে ব্যপক বিক্ষোভের তথাকথিত তিনটি ভিডিও। কিন্তু আমরা আমাদের অনুসন্ধানে দেখেছি যে এই ভিডিওগুলির সঙ্গে ইরান-ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের কিংবা দুবাইতে আমেরিকার বিরোধী বিক্ষোভের কোনও সম্পর্ক নেই। এই প্রতিবেদনে আমরা ভিডিওগুলির সত্যতা যাচাই করব।
ইজরায়েল নয়, আর্জেন্টিনা:
প্রথম ক্লিপটিতে হঠাৎই কোনও একটি স্থানে ব্যপক বিস্ফোরণ হতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, বিস্ফোরণ হতে সেখানে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি ভয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে ইজরায়েলের তেল আভিবের একটি রাসায়নিক কারখানায় বিস্ফোরণ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে ইসরাইলের রাজধানীর তেল আবিবে রাসায়নিক কারখানায় শক্তিশালী বিস্ফোরণ।”
তবে ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেকের তরফে ভাইরাল ক্লিপ এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর তুরস্কের সরকারি সংবাদমাধ্য়ম TRT World-এর অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্ট প্রদত্ত তথ্য অনুযায়া, ভিডিওটি ২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বরে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসের ইজেইজা এলাকার স্পেগাজিনি শিল্পাঞ্চলে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের দৃশ্য। এই বিস্ফোরণের শিল্পাঞ্চলের একাধিক রাসায়নিক কারখানায় এবং গুদামে আগুন লেগে যায়। জার্মান সংবাদমাধ্যম DW-র একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই বিস্ফোরণের জেরে প্রায় ১৫ জন ব্যক্তি আহত হন।
তেল আভিব নয়, তুরস্কের ভূমিকম্প:
দ্বিতীয় ক্লিপটিতে একের পর এক বহুতল ভেঙে প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে কোনও একটি শহর। পাশাপাশি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বহুসংখ্যক গাড়ি। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, সেটি সম্প্রতি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইজরায়েলের তেল আভিবের দৃশ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে ইসরাইলের রাজধানীর তেল আবিবে রাসায়নিক কারখানায় শক্তিশালী বিস্ফোরণ।”
তবে আজতক ফ্যাক্ট চেকের তরফে ভাইরাল ক্লিপ এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম Daily Sabah-এর অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টের ক্যাপশন থেকে জানা যায়, ক্লিপটি ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্কের পাজারসিক জেলায় হওয়া ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের পরের ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য।
আমেরিকা বিরোধী বিক্ষোভ নয়, দুবাই রান ২০২৫:
তৃতীয় ক্লিপটিতে দুবাইয়ের কোনও একটি সড়কে হাজার-হাজার মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, সেটি দুবাইতে আমেরিকার বিরুদ্ধে ব্যপক বিক্ষোভের দৃশ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “#দুবাইতে #মার্কিন #বিরোধী #নিউজ #বিক্ষোভ।”
তবে ভাইরাল ক্লিপ এবং দাবির সত্যতা জানতে আমাদের তরফে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর একটি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও-র সব থেকে পুরনো সংস্করণ-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্টের ক্যাপশন থেকে জানা যায়, সেটি ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে দুবাইয়ের শেখ জায়েদ রোডে আয়োজিত ‘দুবাই রান ২০২৫’-এর দৃশ্য। এই একই তথ্য-সহ ওই বছরের ২৬ নভেম্বর Asia Run নামক একটি ফেসবুক পেজেই এই একই ভিডিওটি শেয়ার করা হয়েছিল। পাশাপাশি, সেই সময় একাধিক সংবাদমাধ্যমেও এই একই ভিডিও-সহ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল।
এর থেকে প্রমাণ হয় যে ইজরায়েলের উপরে ইরানের হামলার দৃশ্য দাবি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হচ্ছে অসম্পর্কিত সব ভিডিও।
ভিডিওগুলিতে ইজরায়েলের উপরে ইরানের হামলার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
ভাইরাল ভিডিওগুলির সঙ্গে ইরান-ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের কিংবা দুবাইতে আমেরিকার বিরোধী বিক্ষোভের কোনও সম্পর্ক নেই।