
গত ২৩ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার মোটের উপরে শান্তিতেই সম্পন্ন হয়েছে প্রথম দফার বিধানসভা নির্বাচন। গণনার আগে বর্তমানে প্রতিটি বিধানসভার জন্য বরাদ্দ নির্দিষ্ট স্ট্রংরুমে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতে এবং সিসিটিভি নজরদারিতে সংরিক্ষত রয়েছে ভোটে ব্যবহৃত সব ইভিএম। আর এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে একটি ভিডিও। যেখানে, পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিতে ইভিএম ভর্তি একটি গাড়ি আটকে এক ব্যক্তিকে জেরা করছেন বেশকিছু উত্তেজিত জনতা।
অন্যদিকে, তাদের থামানোর চেষ্টা করছেন সেখানে উপস্থিত কেন্দ্রী বাহিনীর জওয়ানরা। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, রাতের অন্ধকারে ইভিএম চুরির সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছে এক বিজেপি কর্মী। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ইভিএম চুরি হাতেনাতে ধরা পড়েছে বিজেপি।। জয় হিন্দ, জয় বাংলা #ভারতেরগর্বমমতা, #বিজেপি_হাটাও_দেশ_বাঁচাও ”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ভিডিওটি কোনো বিজেপি কর্মীকে ইভিএম চুরির সময় আটকের দৃশ্য নয়। বরং এটি ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল বীরভূমের বোলপুরে কোনও নিরাপত্তা কর্মী ছাড়াই কিছু রিজার্ভ ইভিএম (ভোটে অব্যবহৃত) নিয়ে যাওয়ার সময় একটি গাড়িকে আটক করে বোলপুরের বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ-সহ তাঁর দলের কর্মীরা।
সত্য উন্মোচন
ভাইরাল ভিডিও এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি নিয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষণের সময় সেটির ফ্রেমের উপরে ‘বোলপুর নিউজ এক্সক্লুসিভ’ লেখা একটি ওয়াটার মার্ক দেখতে পাওয়া যায়। উক্ত সূত্র ধরে এই সংক্রান্ত অনুসন্ধান চালালে ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল বীরভূম জেলার বোলপুর ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘Bolpur News’এর ফেসবুক পেজে ভাইরাল ভিডিও-র মূল সংস্করণ-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “বোলপুরে চাঞ্চল্য, ঘটনাস্তলে পুলিশ ও কেন্দ্র বাহিনী...শুরু রাজনৈতিক তরজা...যদিও প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, এগুলো রিজার্ভ ইভিএম, কিছু মানুষ এটাকে ভুল ভাবে রটানোর চেষ্টা করছে। ঘটনা তদন্তে প্রশাসন।”
এরপর উক্ত সূত্র ধরে পরবর্তী অনুসন্ধান চালালে ২০২৬ সালের ২৪ এপ্রিল এই সময় অনলাইন-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ভাইরাল ঘটনার ছবি এবং ভিডিও-সহ এই সব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভাইরাল ভিডিওটি ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল বীরভূমের বোলপুরের ঘটনা। ওইদিন প্রথম দফার বিধানসভা নির্বাচনের সম্পন্ন হওয়ার পর ইভিএম পাচার ও পাল্টানোর চেষ্টা করেছেন সেক্টর অফিসার নিজেই। এই অভিযোগে বোলপুরে ইভিএম ভর্তি গাড়ি আটক করে এবং সেক্টর অফিসারকে ঘিরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন বোলপুরের বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ-সহ বেশ কয়েকজন বিজেপি কর্মী। তবে এই অভিযোগ উড়িয়ে দেয় সেক্টর অফিসার সৌমশ্রী মিত্র। তাঁর দাবি, যে ইভিএমগুলি ওই গাড়িতে ছিল তাতে ভোটগ্রহণ করা হয়নি। ওই গাড়িতে থাকা ১৪টি ইভিএম আসলে রিজার্ভ ইউনিট হিসাবে রাখা হয়েছিল, যাতে করে দরকার পড়লে সেগুলি ব্যবহার করা যায়।
পাশাপাশি, ভাইরাল ভিডিও এবং একধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণের সময় আমরা ঘটনাস্থলে বোলপুরের বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষকে উপস্থিত থাকতে দেখতে পাই। তাই এরপর বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমরা বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাদের জানান, “প্রথম দফার বিধানসভা নির্বাচনের সম্পন্ন হওয়ার পর কোনও নিরাপত্তা কর্মী ছড়া কিংবা সেক্টর অফিসার ছড়াই ইভিএম ভর্তি একটি গাড়ি জয়দেব থেকে বোলপুরের দিকে যাচ্ছিল। সেই সময় গাড়িটি দেখে আমাদের সন্দেহ হলে আমরা গাড়িটি আটক করে সেক্টর অফিসার সৌমশ্রী মিত্র-সহ প্রশাসনিক আধিকারীকদের খবর দিই।
দিলীপ ঘোষ আরও জানান, “এরপর পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে গাড়িটিকে বোলপুর এসডিও অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাদের সামনে এসডিও এবং আইসি-সহ অন্যান্য আধিকারীকরা গাড়িতে থাকা ১৪টি ইভিএম পর্যবেক্ষণ করে দেখেন সেগুলি ভোটের জন্য ব্যবহার করা হয়নি। সেগুলি ছিল আসলে রিজার্ভ ইভিএম।” পাশাপাশি, বিষয়টি সম্পর্কে জানতে আজ তকের বীরভূম জেলা সাংবাদিক শান্তনু হাজরার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও এই একই তথ্য প্রদান করেন।
এর থেকে প্রমাণ হয় যে বিভ্রান্তিকর দাবি-সহ শেয়ার করা হচ্ছে বিজেপি প্রার্থীর তরফে রিজার্ভ ইভিএম ভর্তি গাড়ি আটকের ভিডিও।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, রাতের অন্ধকারে ইভিএম চুরির সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছে এক বিজেপি কর্মী।
ভাইরাল ভিডিওটি কোনও বিজেপি কর্মীকে ইভিএম চুরির সময় আটকের দৃশ্য নয়। বরং এটি কোনও নিরাপত্তা কর্মী ছাড়াই বোলপুরে কিছু রিজার্ভ ইভিএম নিয়ে যাওয়ার সময় একটি গাড়ি আটক করে বোলপুরের বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ-সহ তাঁর দলের কর্মীরা।