
একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। আগামী ৯ মে শপথ নেবেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী-সহ মন্ত্রিসভার বাকি সদস্যরা। এই আবহে সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে যে, বিজেপি বঙ্গে ভোটে জয়লাভ করার পর থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ উপর অত্যাচার করা হচ্ছে।
প্রথম ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটি গলির মধ্যে জনাকয়েক যুবক এলোপাথাড়ি লাঠি চালাচ্ছে। কখনই রাস্তার উপর রাখা বাইকে, কখনও আবার আশেপাশের ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে লাঠি মারা হচ্ছে। ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর মুসলিমদের ওপর হা'ম'লা।”
অপর একটি ভিডিওতে গম্বুজ-বিশিষ্ট একটি পাঁচতলা ভবনের উপরিভাগে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। এই ভিডিওটি পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে, বিজেপির বিজয়ের পর ভারতে নাকি মসজিদে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিডিওটি পোস্ট করে তার উপর লেখা হয়েছে, “ভারতে হিন্দুরা মুসলমানের মসজিদে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে আল্লাহর গজব আসতে দেরি নেই।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে ভাইরাল উভয় ভিডিও-র সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ভোট পরবর্তী কোনও ঘটনার কোনও সম্পর্ক নেই। প্রথম ভিডিওটি রাজস্থানের এবং হোলির সময়ের ঘটনা। দ্বিতীয়টি কাশ্মীরের একটি ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যেখানে গত এপ্রিল মাসে অগ্নিকাণ্ড হয়।
সত্য উদ্ঘাটন
প্রথম ভিডিওটি থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হলে ওই একই ভিডিও-সহ এবিপি নিউজ এবং দৈনিক ভাস্করের একাধিক প্রতিবেদন পাওয়া। ২০২৬ সালের ৪ মার্চ প্রকাশিত এই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই ঘটনাটি রাজস্থানের যোধপুরের।
খবর অনুযায়ী, হোলি উৎসব উদযাপনের সময় জনাকয়েক সমাজবিরোধী যুবক প্রতাপনগর থানা এলাকায় স্থানীয় কয়েকজন মহিলার সঙ্গে অভব্য় আচরণ করে। তাঁদের উত্যক্তও করা হয়। এই সময় স্থানীয় বাসিন্দারা এই ধরনের কাজকর্মের প্রতিবাদ জানালে ওই যুবকেরা পাল্টা স্থানীয়দের উপর চড়াও হয়। অনেকের বাড়িতে হামলা করা হয়। এমনকি, রাস্তার উপরে থাকা বাইকেও ভাংচুর চালানো হয়। পুরো ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দারের মোবাইল ক্যামেরায় এবং সিসিটিভিতে ধরা পড়ে।
এই ভাংচুরে জড়িত থাকা এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে পুলিশ। তবে সরকারিভাবে অভিযোগ দায়ের না হওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়নি। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে যে যোধপুরের একটি পুরনো এবং অসম্পর্কিত ঘটনা নিয়ে বর্তমানে ভুয়ো খবর ছড়ানো হচ্ছে।
দ্বিতীয় ভিডিওটি থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে গুগল লেন্সে তা খোঁজা হলে ওই একই ভিডিও কাশ্মীর অবসার্ভার, নিউজ 18 উর্দুর মতো একাধিক সংবাদ মাধ্যমে পাওয়া যায়। ১০ এপ্রিল প্রকাশিত এই প্রতিবেদনগুলি থেকে জানা যায়, এই ঘটনাটি জম্মু-কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরের হায়দারপোরা এলাকায় ঘটেছিল যখন একটি দারুল উলুম (ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান)-এ আগুন লেগে যায়।
একাধিক সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, আগুনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে দমকল পৌঁছয় এবং দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। খবর অনুযায়ী, আগুন নেভাতে গিয়ে এক দমকলকর্মী আহত হলেও এ ছাড়া আর কেউ হতাহত হয়নি। প্রাথমিক অনুমানে দমকল জানায় যে শর্ট সার্কিট থেকেই আগুন লেগে থাকতে পারে। এই রিপোর্টগুলি থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে এটি কোনও মসজিদে আগুন লাগানোর ঘটনা নয় বরং একটি ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।
অর্থাৎ বুঝতে বাকি থাকে না যে সম্পূর্ণ অসম্পর্কিত ও পুরনো ভিডিও শেয়ার করে একটি ভুয়ো দাবি করা হচ্ছে যা আদতে ভিত্তিহীন।
বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর মুসলিমদের উপর অত্যাচার শুরু হয়েছে এবং মসজিদে আগুন লাগানো হয়েছে।
ভাইরাল দু’টি ভিডিওর কোনওটিই পশ্চিমবঙ্গের ভোট-পরবর্তী ঘটনার নয়। প্রথম ভিডিওটি রাজস্থানের যোধপুরে হোলির সময়ের ভাঙচুরের ঘটনা। দ্বিতীয় ভিডিওটি কাশ্মীরের শ্রীনগরে একটি ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।