
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় দুটি বস্তি এলাকার ছবি-সহ ফটোকার্ড ভাইরাল হয়েছে। প্রথম ছবিতে সারিবদ্ধভাবে বাঁশের কাঠামোর উপর প্ল্যাস্টিক ব্যবহার করে তৈরি ঘর দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় ছবিতে একটি মাঠের উপরে প্রচুর পরিমাণে তাবু দেখা যাচ্ছে যা প্ল্যাস্টিকের তৈরি। ছবিগুলি ছড়িয়ে তা অসমের দৃশ্য বলে দাবি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বলা হচ্ছে যে মুসলিমদের বাড়ি-ঘর উচ্ছেদ করে তাদের এভাবে রাখা হচ্ছে।
প্রথম ছবিটি পোস্ট করে তার সঙ্গে লেখা হয়েছে, “ভারতের আসামে উচ্ছেদ অভিযান, ঘর হারিয়ে তাবুতে আশ্রয় হাজারো মুসলিম পরিবার। হে আমাদের রব আপনি আমাদের সকল মুসলিম ভাই দেরকে রক্ষা করুন আমিন।”
দ্বিতীয় ছবির সঙ্গে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “এটা ফি'লি'স্তি'নের গাজা নয়, এটা ভারত দ্বিতীয় গাজা হতে চলেছে, ভারতের আসামে উচ্ছেদ অভিযান:ঘর হারিয়ে তাবুতে হাজারো মুসলিম পরিবার।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ছবি দুটির একটিও ভারতের নয়। সেই সঙ্গে, ভারতে অনুপ্রবেশকারী সন্দেহেও যাদের আটক করা হয়েছে, তাদেরও এমন কোনও স্থানে রাখা হয়নি।
সত্য উদ্ঘাটন
প্রথম ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে খোঁজা হলে ওই একই ছবি বাংলাদেশের প্রথম সারির সংবাদ মাধ্যম দ্য ডেইলি স্টারের একটি রিপোর্টে পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশি সাংবাদিক ফিলিপ গাইনের লেখা “The story of a floating people” শীর্ষক একটি নিবন্ধে এই ছবিটি ব্যবহার করা হয়। ছবিটিও ফিলিপেরই তোলা।
ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়েছিল, “মুন্সিগঞ্জের গোয়ালিমন্দ্রায় একটি খেলার মাঠে বেদেদের তাবু।” এই নিবন্ধটি ছিল বাংলাদেশের বেদে সমাজের মানুষদের নিয়ে। বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে নদীকেন্দ্রিক যাযাবর জীবনযাপন করে আসছে। একসময় নৌকাই ছিল তাদের বসতি ও জীবিকার প্রধান ভরসা, কিন্তু অর্থনৈতিক পরিবর্তন, নদীর অবক্ষয় এবং সামাজিক বাস্তবতার কারণে অনেক বেদে পরিবার এখন স্থলভাগে এই ধরনের বসতি গড়তে বাধ্য হচ্ছে। এই বাস্তবতার ছবি তুলে ধরা হয় সেই নিবন্ধে।
দ্বিতীয় ছবিটি সার্চ করা হলে তা ২০২৫ সালের একাধিক কম্বোডিয়া ভিত্তিক নিউজ রিপোর্টে পাওয়া যায়। ছবির ক্যাপশন থেকে জানা যায়, থাইল্যান্ড–কম্বোডিয়া সীমান্ত সংঘাতের জেরে তৈরি হওয়া ব্যাপক মানবিক সংকটের কারণে কম্বোডিয়ার প্রেহ ভিহিয়ার প্রদেশে এই ক্যাম্প বা শিবির তৈরি করা হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, থাইল্যান্ড–কম্বোডিয়া সীমান্তবর্তী এলাকায় গত বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রায় ১৫০ জন নিহত হন এবং পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। উভয় দেশই সংঘাত শুরুর জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সীমান্ত বিরোধ পুরোপুরি মেটেনি।
অবশ্য এ কথা সত্যি যে অসমেও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের আটক করে রাখার জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে। তবে এই ধরনের প্ল্যাস্টিক দ্বারা তৈরি ছাউনি কোথাও বানানো হয়নি। ডয়েচে ভেলের একটি প্রতিবেদনে দেখা যাবে অসমে তৈরি ডিটেনশন ক্যাম্প ঠিক কী ধরনের।
সবমিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায় যে দুটি অসম্পর্কিত ছবি ছড়িয়ে কীভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
অসমে উচ্ছেদ হওয়া মুসলিম পরিবারগুলির বর্তমান দুরবস্থার ছবি। ঘরবাড়ি হারানোর পর তাদের প্ল্যাস্টিকের তাবুতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করা হয়েছে।
ছবিগুলির কোনওটিই অসম বা ভারতের নয়। একটি ছবি বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জের গোয়ালিমন্দ্রায় বেদে সম্প্রদায়ের অস্থায়ী বসতির ছবি। অন্য ছবিটি থাইল্যান্ড–কম্বোডিয়া সীমান্ত সংঘাতের জেরে কম্বোডিয়ার প্রেহ ভিহিয়ার প্রদেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য তৈরি শিবিরের ছবি।