
রাজ্যে প্রথম দফার ভোট ২৩ এপ্রিল। তার আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে যে, এক তৃণমূল নেত্রী কোনও এক লোকালয়ে গিয়ে এলাকাবাসীকে হুমকি দিয়েছেন যাতে একটিও ভোট বিজেপিতে না পড়ে। অন্যথায় তিনি আগুন লাগিয়ে দেবেন।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ওই মহিলাকে বলতে শোনা যাচ্ছে, “একটাও বিজেপির ঝান্ডা যেন না বাঁধে। কেউ মৌসুমীকে ভোট দেবে না। একটা ভোটও যদি মৌসুমীকে পড়েছে আগুন লাগিয়ে দেব আমি। আগুন লাগিয়ে দেব একটাও ভোট যদি ওখানে পড়েছে। একটাও ভোট মৌসুমীকে যদি গেছে তবে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। কেউ যদি একটাও ভোট মৌসুমীকে দিয়েছে সে নিজের ঘরে থাকতে পারবে না। আমি একদম মার মেরে দেব।”
ভিডিওটি শেয়ার করে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা দাবি করছেন যে এই হুমকি দেওয়া মহিলা তৃণমূলের এবং তিনি আসন্ন বিধানসভার আগে হুমকি দিচ্ছেন যাতে কেউ বিজেপিকে ভোট না দেয়। এক ব্যক্তিকে এই ভিডিওটি শেয়ার করে বলতে শোনা যাচ্ছে, “টিএমসি-র দালাল মহিলাটা দেখুন কীভাবে মানুষকে ধমকি দিচ্ছে। বিজেপিকে ভোট দিলে নাকি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবে।”
একই ভিডিও অন্যান্য পেজ থেকে শেয়ার করে লেখা হয়েছে, “কেউ বিজেপিকে ভোট দেবে না ভোট দিলে আগুন লাগিয়ে দেবো। দেখুন কিভাবে হুশিয়ারি দিচ্ছে মমতা ব্যানার্জীর অনুপ্রাণিত এই মহিলা।”
আরেক ব্যক্তি আবার এই ভিডিও শেয়ার করে বলছেন, “বিজেপির কিছু অন্ধ ভক্ত নেতাকর্মীরা আছে, যে বলছে যে তৃণমূলে যদি একটা ভোটও পড়ে সে আগুন লাগিয়ে দেবে।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে ভাইরাল দাবিগুলি অসত্য। প্রথমত, ভিডিওটি সাম্প্রতিক নয় বরং ২০২২ সালের। দ্বিতীয়ত, এই ভিডিওতে এক তৎকালীন বিক্ষুব্ধ বিজেপি নেত্রী নিজেই বিজেপিতে ভোট না দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন।
সত্য উদ্ঘাটন
এই ভিডিওটির কয়েকটি বিষয় উক্ত নানা দাবির সত্যতা সম্পর্কে সংশয় জাগায়। প্রথমত, ভিডিওতে হুমকি প্রদানকারী মহিলাকে মাস্ক পরে থাকতে দেখা যায় যা ইঙ্গিত করে ঘটনাটি সাম্প্রতিক নয় বরং বেশ পুরনো এবং করোনাকালের হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভিডিও-র আরেকটি ফ্রেমে বিজেপির পতাকা ধরে থাকা এক মহিলার পাশে দাঁড়িয়েই তাঁকে হুমকি দিতে দেখা যায়।
সবমিলিয়ে, দাবির সঙ্গে দৃশ্যগুলির সাযুজ্য নেই তা বোঝা যায়।
যেহেতু ভিডিওতে ওই মহিলাকে বারবার জনৈক মৌসুমীকে ভোট না দেওয়ার হুমকি দিতে শোনা যাচ্ছে, তাই এই সম্পর্কে যখন কিওয়ার্ড সার্চ করা হয় তখন ওই একই মহিলার ছবি-সহ প্রতিবেদন সব্যসাচী নামের একটি অনলাইন পোর্টালে পাওয়া যায়। ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এই খবরের শিরোনামে লেখা হয়, “খড়্গপুরে বিজেপি নেত্রী হয়ে বিজেপি প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান।”
এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের পুরসভা নির্বাচনের সময় খড়গপুর পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের দাপুটে বিজেপি নেত্রী বেবি কোলের বদলে টিকিট দেওয়া হয়েছিল মৌসুমী দাসকে। বেবি ছিলেন খড়গপুরের বিদায়ী বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের অনুগামী। তাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ওই বিজেপি নেত্রী হুমকি দেন যদি মৌসুমী দাসকে একটাও ভোট পড়ে তাহলে "আগুন লাগিয়ে দেব"!
বিষয়টি নিয়ে সবিস্তারে সার্চ করা হলে ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এবিপি আনন্দের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই খবরে উল্লেখ পায়, বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দিতে বারণ করেছিলেন খোদ বিজেপি নেত্রী বেবি কোলে। তৎকালীন বিজেপি নেত্রীর অভিযোগ ছিল যে, পুরভোটের টিকিট দেওয়ার জন্য তাঁর থেকে ৫ লক্ষ টাকা দাবি করেছিল দল। এই ঘটনায় তিনি জেলা নেতৃত্বের উপর ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং এলাকায় গিয়ে আহ্বান জানান যেন কেউ বিজেপিকে ভোট না দেয়।
এই বিষয়ে ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এবিপি আনন্দের ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও প্রকাশ পায়। সেখানে বেবি কোলেকে বিজেপির পতাকা হাতে নিয়েই বিজেপি প্রার্থী মৌসুমী দাসের সমর্থনে লাগানো পোস্টার ছিঁড়ে ফেলতে দেখা যায়। এমনকি বিজেপির পতাকা-সহ দলীয় কর্মীদের পাশে নিয়েই তিনি হুমকি দেন যে বিজেপিকে ভোট দেওয়া হলে তিনি ঘরে ঢুকে মারবেন।
ঘটনাচক্রে, খড়গপুরের বেবি কোলে দ্বিতীয়বার শিরোনামে উঠে আসেন ২০২৫ সালের জুন মাসে, কিন্তু বিজেপি নয়, বরং তৃণমূল নেত্রী হিসেবে। অনিল দাস নামে এক প্রবীণ সিপিএম নেতাকে তিনি প্রকাশ্যে রাস্তার উপর মারধর করেন এমনকি মুখে কালি লেপে দেওয়ারও অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার পর গত বছর জুলাই মাসে অভিযুক্ত বেবি কোলেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল কংগ্রেস।
অর্থাৎ, সবমিলিয়ে স্পষ্ট যে যে ২০২২ সালের পুরভোটের সময়কার একটি ভিডিও বর্তমানে ভুয়ো দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে, যা বিভ্রান্তিকর।
ভিডিওতে এক তৃণমূল নেত্রী এলাকাবাসীকে হুমকি দিচ্ছেন যাতে কেউ বিজেপিকে ভোট না দেয়, নইলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হবে।
ভিডিওটি ২০২২ সালের পুরভোটের সময়কার। এতে তৎকালীন বিজেপি নেত্রী বেবি কোলেকে পুরভোটের টিকিট না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বিজেপি প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যাচ্ছে।