
পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতির মতোই, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ফের একাধিক হামলার ঘটনায় ফিরে এসেছে ভোট পরবর্তী হিসাংসার স্মৃতি। এখনও পর্যন্ত বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর মিলেছে।
এর মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। যেখানে এক মহিলাকে ভুয়ো ব্যান্ডেজ ব্যবহার করে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করতে দেখা যাচ্ছে। এরপর সেখানে উপস্থিত কয়েকজন ব্যান্ডেজে টান মারলে সেটা মাথা থেকে খুলে বেরিয়ে আসছে এবং দেখা যাচ্ছে কোনও ক্ষত নেই।
অনেকেই এই ভিডিওটি শেয়ার করে ভিডিওতে নকল ব্যান্ডেজ ব্যবহার করা এই মহিলাকে এক তৃণমূল কর্মী বলে দাবি করছেন। ভিডিওটি শেয়ার করে অনেকে লিখেছেন, "ভিডিও করছিল বলে, BJP নাকি তার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, তারপর কি হলো দেখুন... তৃণমূল কর্মীরাও মমতা ব্যানার্জির মতোই ড্রামা-বাজ...।"
News18 Malayalam, Janmabhumi, Times Now, The Times of India এবং The Economic Times-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যম এই ভিডিওটি প্রকাশ করে একই দাবি করেছে।
ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেকের অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, ভিডিওটি পশ্চিমবঙ্গের নয় এবং ভোট পরবর্তী হিংসার সঙ্গেও এর কোনও সম্পর্ক নেই। এটি বিহারের একটি পৃথক ঘটনার।
সত্য উদ্ঘাটন
ভাইরাল ভিডিওটির কী-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চ করে একই ভিডিওটি পাওয়া যায় Maurya Dhwaj Express নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে। ৬ মে আপলোড করা এই ভিডিওর ভয়েস-ওভারে বলা হয়েছে, বিভ্রান্তি ছড়াতে ভুল দাবি করে ভিডিওটি ছড়ানো হচ্ছে।
চ্যানেলের দাবি, ভিডিওটি পুরনো এবং বিহারের মুজাফফরপুর শহরের শ্রী কৃষ্ণ মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হাসপাতালে (এসকেএমসিএইচ) রেকর্ড করা। ভয়েস-ওভারে আরও বলা হয়েছে, এটি হাসপাতালের ট্রলি-কর্মী ও রোগীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা।
লোকেশন নিশ্চিত করতে আমরা কীওয়ার্ড সার্চ করে ২০২৫ সালের মুজাফ্ফরপুর এসকেএমসিএইচ-এর কিছু ভিডিও পাই। সেগুলির সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওটির দৃশ্যপট মিলিয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি আসলে বিহারের।
এরপর Maurya Dhwaj Express-এর সম্পাদক ব্রহ্মদেব কুশোয়াহার সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি জানান, ভিডিওটি প্রায় এক সপ্তাহ আগের এবং তাঁদের এক রিপোর্টার প্রেম শঙ্কর ঘটনাটি ক্যামেরাবন্দি করেন।
প্রেম শঙ্কর ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক টিমকে জানান, ২৮ এপ্রিল তিনি মুজাফ্ফরপুর এসকেএমসিএইচ-এর ভিতরে এই ভিডিওটি ধারণ করেন। সেখানে এক ট্রলি-কর্মী রোগীদের মারধরের অভিযোগ তুলে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় সামনে আসেন। তখনই রোগীরা তাঁকে প্রশ্ন করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয় এবং ভুয়ো চোটের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
ঘটনাচক্রে প্রেম শঙ্কর গত ৪ মে অর্থাৎ রাজ্যে বিধানসভা ভোটের ফলপ্রকাশের দিন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে ভিডিওটি পোস্ট করেছিলেন। ক্যাপশনে তিনি লেখেন, “মিডিয়ার লোকজনকেও এখন এসব দেখতে হচ্ছে, যদিও সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
প্রেম শঙ্কর তাঁর মোবাইলের মিডিয়া গ্যালারি থেকে মূল ভিডিওর একটি স্ক্রিনশটও ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেককে দেন, যেখানে রেকর্ডিংয়ের তারিখ ২৮ এপ্রিল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
পরবর্তীতে কীওয়ার্ড সার্চ করে Live Hindustan এবং First Bihar-এ ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখের একাধিক রিপোর্ট পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, হাসপাতালের এমার্জেন্সি ওয়ার্ডের বাইরে এই সংঘর্ষ হয়েছিল। এরপর হাসপাতালের সুপার নিরাপত্তা সংস্থাকে নির্দেশ দেন, ওই এলাকা থেকে সব ট্রলি-কর্মীকে সরিয়ে দিতে।
অর্থাৎ বুঝতে বাকি থাকে না যে বিহারের একটি পুরনো ভিডিওকে ভুলভাবে ভোট পরবর্তী হিংসার প্রেক্ষিতে তৃণমূল কর্মীর ভুয়ো ব্যান্ডেজের নাটক বলে ছড়ানো হয়েছে।
ভোট পরবর্তী হিংসায় আহত হওয়ার দাবি করতে এক তৃণমূল কর্মী ভুয়ো ব্যান্ডেজ ব্যবহার করছিলেন, যা লাইভ টেলিভিশনে ফাঁস হয়ে যায়।
এই ভিডিওটি ২৮ এপ্রিল বিহারের মুজাফ্ফরপুরের শ্রী কৃষ্ণ মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল-এ ধারণ করা। এতে রোগীর পরিবারের সঙ্গে ট্রলি-কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা দেখা যাচ্ছে।