
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নানা জায়গায় অবৈধ দখল হটাতে তৎপর হয়েছে নতুন বিজেপি সরকার। উচ্ছেদ করা হচ্ছে সরকারি জমিতে জবরদখল করে রাখা দোকান, ক্লাব, দলীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে নানা ধরনের কাঠামো। এই ধারা বজায় রেখে দমদম স্টেশন চত্ত্বরেও সম্প্রতি অবৈধভাবে দখল করে বসা দোকানগুলিকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এই আবহে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়েছে।
এই ভিডিওটি রাজ্যে হতে থাকা নানা ধরনের হকার উচ্ছেদের প্রেক্ষাপটে শেয়ার করা হচ্ছে। ভিডিওতে একটি ধ্বংস্তূপের উপর দুই নাবালিকাকে স্কুল ইউনিফর্ম পরে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি শেয়ার করে একে দমদম স্টেশনে উচ্ছেদের সঙ্গে জুড়ে শেয়ার করা হচ্ছে। ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “স্টেশনে খাবারের দোকান ছিল বাবার, রাষ্ট্র তা ভেঙে দিয়েছে অসহায় দুই শিশু । লড়াই আরও তীব্র হোক পূর্ণ সমর্থন রইলো।”
একই ভিডিও শেয়ার করে কেউ লিখেছেন, “বাবার ছোট্ট খাবারের দোকানটাই ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা। আজ স্টেশনে সেই দোকান ভেঙে যেতে দেখে স্কুল থেকে ফেরা দুই ছোট্ট মেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তাদের চোখের জল শুধু দোকান হারানোর নয়, স্বপ্ন হারানোরও। যে বাবার ঘামে সংসার চলত, আজ তার অসহায় মুখ দেখে সন্তানদের বুক ফেটে যাচ্ছে।”
কেউ আবার লিখেছেন, “বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গে হকারদের পুনর্বাসন দিতে যতগুলো হকার মার্কেট তৈরি হয়েছিল, বিজেপির আজ অবধি মুরোদ হলো না সারা দেশে ততগুলো সুলভ শৌচালয় তৈরি করা। গরিবের দোকানের ওপর বুলডোজার চালাচ্ছে, অথচ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় আম্বানি-আদানি'দের কোটি কোটি টাকার ঋণ মকুব করছে বিজেপি সরকার।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে পোস্টগুলি বিভ্রান্তিকর। দমদম স্টেশনে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও ভিডিওটি ২০২৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেস শাসিত সরকারের উচ্ছেদ অভিযানের।
সত্য উদঘাটন
ভাইরাল ভিডিওটি থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে ভিডিওটি খোঁজা হলে দেখা যায়, ওই একই ভিডিও ২০২৪ সালের ২৭ জুন এক ফেসবুক ব্যবহারকারী পোস্ট করেছিলেন। যা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় যে সাম্প্রতিক সময়ে দমদম স্টেশনে হকার উচ্ছেদের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। সেই সঙ্গে আরও উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, সেই সময় রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল কংগ্রেস।
ভিডিওটি পোস্ট করে ওই ব্যবহারকারী লিখেছিলেন, “বোলপুর এ ফুটপাতে বাবার দোকান ভাঙ্গা দেখে মেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছে। ধিক্কার জানাই মমতা ব্যানার্জী”।
এই বিষয়ে আরও সার্চ করা হলে ২০২৪ সালের ২৯ জুন এই সময়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বোলপুরে সরকারি জমির উপর বেআইনিভাবে ব্যবসা করার জন্য রাজু দাসের দোকান ভেঙে ফেলা হয় প্রশাসনের তরফে। আর সেই ভাঙা দোকানের সামনেই কাঁদতে দেখা যায় রাজুর দুই মেয়েকে। সেই দৃশ্য দাগ কাটে রাজ্যবাসীর মনে।
নিউজ ১৮-এও এই সংক্রান্ত একটি খবর পাওয়া যায় যা ২০২৪ সালের ২ জুলাই প্রকাশ পেয়েছিল। দুই রিপোর্টের নির্যাস, পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস ওই দোকানটি রাজু দাসের পরিবারের একমাত্র উপার্যজনের পথ ছিল। দোকানটি একটি গার্ল্স স্কুলের সামনে গড়ে ওঠে। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেআইনি দখল উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। তারপর প্রশাসনিক পদক্ষেপে ভাঙা পড়ে রাজু দাসের দোকান।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়, সরকারি জমি ও রাস্তার অংশ দখল করে গড়ে ওঠা বেআইনি নির্মাণ সরাতেই এই অভিযান চালানো হয়। তবে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেন। পরিবারটির পুনর্বাসন বা বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা করা হয়। একইসঙ্গে পরিবারটিকে সরকারি বিভিন্ন সহায়তা প্রকল্পের আওতায় আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়।
অর্থাৎ বুঝতে বাকি থাকছে না তৃণমূল জমানায় হওয়া উচ্ছেদের ভিডিওকে কীভাবে বর্তমানে দমদম স্টেশনে হওয়া উচ্ছেদের সঙ্গে জুড়ে বিভ্রান্তিকর দাবি প্রচারিত হচ্ছে।
দমদম স্টেশন চত্বরে সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানে এক খাবারের দোকান ভেঙে দেওয়ায় দোকান মালিকের দুই স্কুলপড়ুয়া মেয়ের কান্না।
ভাইরাল ভিডিওটির সঙ্গে দমদম স্টেশনের সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানের কোনও সম্পর্ক নেই। ভিডিওটি ২০২৪ সালের জুন মাসে বীরভূমের বোলপুরে প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানের সময় ধারণ করা হয়েছিল। সে সময় তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় ছিল।