
ছাব্বিশের ভোটে রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই যেভাবে শিরোনামে থেকেছেন তৃণমূলের নেতা-বিধায়ক-সাংসদরা, সেইভাবে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে ডিম বা পচা ডিম। এই ডিমই অস্ত্র হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজে হাতে গড়া দলের ছোটো-মাঝারি নেতাদের তো বটেই সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও পচা ডিমের ঘা খেতে হয়েছে। সেই তালিকায় নাম উঠেছে মদন মিত্র, সৌগত রায় বা সব্যসাচী দত্তদের মতো হেভিওয়েটদেরও। কিন্তু ডিম-কে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার পশ্চিমবঙ্গেই প্রথম হচ্ছে এমনটা কিন্তু নয়। এর পিছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদের অভিনব ও প্রতীকী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ডিম, বিশেষ করে পচা ডিম। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, কোনও নেতা, জনপ্রতিনিধি বা বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের কাজে অখুশি হলেই তাঁদের লক্ষ্য করে ডিম ছুড়েছে জনগণ বা কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়। ভারতেও এমন প্রতিবাদ আগে হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে এখন যে হারে ডিম-কে ব্যবহার করা হচ্ছে, এমনটা আর কোথাও হয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্নই উঠতেই পারে। কারণ, পাহাড় থেকে জঙ্গলমহল- এত বড় রাজ্যের প্রায় সব জায়গায় তৃণমূলের বর্তমান ও প্রাক্তন নেতাদের প্রতিদিন, নিয়মিত কার্যত প্রতি মুহূর্তে ডিমের শিকার হতে হচ্ছে।
কবে থেকে ডিম হল প্রতিবাদের অস্ত্র?
ইতিহাস সাক্ষী, জনসমক্ষে অপছন্দের ব্যক্তি বা ব্যর্থ অভিনয় শিল্পীদের দিকে পচা ফল ও পচা ডিম নিক্ষেপের রীতি ইউরোপে মধ্যযুগ থেকেই প্রচলিত ছিল। ১৬শ ও ১৭শ শতকে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে কোনও নাটক বা জনসমাবেশে দর্শক অসন্তুষ্ট হলে শিল্পীদের দিকে পচা টমেটো, বাঁধাকপি কিংবা ডিম ছুড়ে মারতেন। তখন এগুলি ছিল সহজলভ্য এবং কম খরচেও মিলত। আর তাই এইগুলিই ক্রমাগত প্রতিবাদীদের মোক্ষম অস্ত্রে পরিণত হতে থাকে। আমাদের রাজ্যের নানা ঘটনা দেখলে তার প্রমাণ সহজেই পাওয়া যায়।
রাজনৈতিক প্রতিবাদের অস্ত্র
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপ ও আমেরিকায় গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ডিম নিক্ষেপ রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ হয়ে ওঠে। নির্বাচনী প্রচারসভা বা জনসভায় অপছন্দের প্রার্থীকে বিব্রত করতে বিরোধীরা ডিম ছুড়ত। তৎকালীন সংবাদপত্রগুলির প্রতিবেদনে এমন বহু ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিশেষ করে ১৮৮০ এবং ১৮৯০-এর দশকে ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় একাধিক নির্বাচনী সভায় প্রার্থীদের দিকে ডিম নিক্ষেপের ঘটনায় তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল। সেই 'সংস্কৃতি' বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হতে সময় নেয়নি।
বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা
বিশ শতকে সংবাদমাধ্যমের প্রসারের ফলে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা আরও বেশি প্রচার পেতে শুরু করে। কোনও রাজনৈতিক নেতার দিকে ডিম ছোড়া মানে শুধু তাকে অপমান করা নয়, বরং সংবাদ শিরোনামে উঠে আসা। ১৯৭৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম ফ্রাশারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলাকালীন ডিম নিক্ষেপের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন দেশে একই ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকে।
বড় বড় ব্যক্তিদের উপর ডিম নিক্ষেপ
১৯৯১ সালের ২৭ নভেম্বর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী জন মেজর নির্বাচনী প্রচারের সময় বিক্ষোভকারীদের ডিম নিক্ষেপের মুখে পড়েন। অর্থনৈতিক মন্দা এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই এই প্রতিবাদ হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এরপর ১৯৯০-এর দশকে ইউরোপের একাধিক দেশে ডিম নিক্ষেপ রাজনৈতিক বিক্ষোভের পরিচিত কৌশল হয়ে ওঠে।
২০০৯ সালের ৫ মে ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের রচডেলে জনসংযোগ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় এক ব্যক্তি তাঁর দিকে ডিম নিক্ষেপ করেন। ডিমটি তাঁর কাঁধে লাগে। অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষই এর কারণ বলে ধরা হয়েছিল।
ভারতে ডিম নিক্ষেপের রাজনীতি
ভারতেও ডিম বহুবার রাজনৈতিক প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন বা নাগরিক গোষ্ঠী নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে ডিম ব্যবহার করেছে। ২০০৯ সালের ২৬ এপ্রিল, লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদম্বরমের দিকে একজন জুতো ছুড়েছিলেন। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মধ্যপ্রদেশে প্রচার চালানোর সময় প্রবীণ বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানির দিকেও ডিম ছোড়া হয়েছিল। সেই তালিকায় রয়েছেন অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো নেতার নামও।
পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রে ছাত্র ও বিরোধী সংগঠনগুলির বিক্ষোভে ডিম ব্যবহারের নজির রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দফতর বা নেতাদের কুশপুতুলের উপর ডিম নিক্ষেপ করে প্রতীকী প্রতিবাদও করা হয়েছে।
কেন ডিমই প্রতিবাদের প্রতীক?
ডিম প্রতিবাদের অস্ত্র,তার প্রধান কারণই হল এটা সহজলভ্য এবং তুলনামূলক সস্তা। আবার ডিম নিক্ষেপ প্রাণঘাতী নয়। ফলে প্রতিবাদকারী নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু গুরুতর শারীরিক আঘাতের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। অনেকে এও বলেন, পচা ডিমের দুর্গন্ধ অপমান ও প্রত্যাখ্যানের শক্তিশালী প্রতীক। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তাঁর নীতি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
সুতরাং, পচা ডিম বা ডিম নিক্ষেপ শুধুমাত্র একটি তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ নয়, কয়েক শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদের অংশ। মধ্যযুগীয় ইউরোপের নাট্যমঞ্চ থেকে শুরু করে আধুনিক রাজনৈতিক মঞ্চ—ডিম আজও জনরোষ, ব্যঙ্গ এবং অসন্তোষ প্রকাশের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে টিকে রয়েছে। আর তারই ফল ভোগ করতে হচ্ছে তৃণমূলের নেতাদের।