
চোরবাগানের দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠন করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বুধবার, ২১ অক্টোবর মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল নির্দেশিকা জারি করে জানান, ৬ সদস্যের তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীকে SIT-এর চেয়ারপার্সন করা হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট, পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ রাজ্য সরকারের কাছে জমা দিতে হবে দলটিকে।
গত ১৭ অক্টোবর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপের কাছে পদপিষ্টের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। কীভাবে এই ঘটনা ঘটল, ভিড় নিয়ন্ত্রণে কোথাও গাফিলতি ছিল কি না এবং কোন পরিস্থিতিতে ভিড়ের চাপ বাড়ল, তা খতিয়ে দেখবে SIT। তদন্তে প্রয়োজনীয় সব নথি, তথ্য ও সহযোগিতা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দফতর, কর্তৃপক্ষ ও সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কারা রয়েছেন SIT-তে?
রাজ্য সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, ৬ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দলের চেয়ারপার্সন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী। বাকি সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা ও অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের প্রধান সচিব। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (STF) ডিরেক্টর জেনারেল ও ইন্সপেক্টর জেনারেল। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল ও ইন্সপেক্টর জেনারেলের মনোনীত একজন প্রতিনিধি, যাঁর পদমর্যাদা অন্তত অতিরিক্ত ডিরেক্টর জেনারেল। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের মনোনীত যুগ্মসচিব পদমর্যাদার বা তার উপরের স্তরের একজন প্রতিনিধি। কলকাতায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর (NDRF) একজন প্রতিনিধি। এছাড়াও তদন্তের প্রয়োজনে রাজ্য সরকারের কাছে অন্য কোনও আধিকারিককে দলে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধও জানাতে পারবে SIT।
কী কী বিষয় খতিয়ে দেখবে তদন্তকারী দল?
রাজ্য সরকারের নির্দেশে তদন্তের পরিধি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমেই ঘটনার সঠিক সময়, স্থান এবং পরিস্থিতি নির্ধারণ করবে SIT। কীভাবে প্রথমে ভিড়ের চাপ তৈরি হল এবং তা কীভাবে পদপিষ্টের ঘটনায় পরিণত হল, তা খতিয়ে দেখা হবে। মণ্ডপে কত মানুষ উপস্থিত ছিলেন, প্রবেশ ও বেরনোর পথে ভিড়ের গতিবিধি কেমন ছিল এবং নিরাপদ ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি মানুষ জমায়েত হয়েছিলেন কি না, তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
অতিরিক্ত ভিড়, খারাপ আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত বা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়ের পরিস্থিতি, গেট পরিচালনা, গুজব, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পর্যাপ্ত প্রবেশ ও বেরনোর পথের অভাব এবং কাঠামোগত ত্রুটির মতো সম্ভাব্য কারণগুলি খতিয়ে দেখা হবে। কোনও ঘোষণা, হুইসেল, গুজব কিংবা আচমকা মানুষের চলাচল ভিড়ের চাপে ইন্ধন জুগিয়েছিল কি না, তাও পরীক্ষা করা হবে। মণ্ডপের রাস্তা, ব্যারিকেড, সিঁড়ি, গেট, জরুরি নির্গমনপথ এবং অন্যান্য প্রবেশ ও বেরনোর ব্যবস্থার অবস্থা ও পর্যাপ্ততাও পরীক্ষা করবে SIT।
আয়োজক থেকে পুলিশ, নজরে সব পক্ষ
ঘটনার সময় পুজো উদ্যোক্তা, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ, অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা, হাসপাতাল, দমকল এবং পুরসভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি ও ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি কত দ্রুত পদক্ষেপ করেছিল এবং তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল কি না, তা-ও তদন্তের বিষয়।
তদন্তের স্বার্থে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলে তোলা ভিডিয়ো, ফরেন্সিক রিপোর্ট, কল রেকর্ড, থানার নথি, কন্ট্রোল রুমের লগ, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য শারীরিক প্রমাণ খতিয়ে দেখা হবে।
পুজোর অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, পর্যাপ্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকল্পনা তৈরি এবং কার্যকর করা হয়েছিল কি না, তাও পরীক্ষা করা হবে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের (NDMA) নির্দেশিকা-সহ প্রাসঙ্গিক আইন, আদালতের নির্দেশ এবং গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
গাফিলতি মিললে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপের সুপারিশ
রাজ্য সরকারের নির্দেশে বলা হয়েছে, আয়োজক, পুলিশ, কলকাতা পুরসভা, পূর্ত দফতর, দমকল ও জরুরি পরিষেবা, সিইএসসি বা অন্য কোনও সংস্থা কিংবা ব্যক্তির বিরুদ্ধে গাফিলতি, কর্তব্যে অবহেলা বা সমন্বয়ের ব্যর্থতার অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে SIT-কে। প্রমাণ ও তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী উপযুক্ত পদক্ষেপের সুপারিশ করতে পারবে দলটি।
পাশাপাশি, উত্তর কলকাতার মতো ঘিঞ্জি এলাকায় বড় দুর্গাপুজোর জমায়েত নিয়ন্ত্রণের জন্য ভবিষ্যতে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়েও সুপারিশ করবে SIT। সম্ভাব্য ভিড়ের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, নিরাপদ প্রবেশ ও নির্গমনপথ, সিসিটিভি নজরদারি, জনসাধারণের উদ্দেশে ঘোষণা করার ব্যবস্থা, জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন দফতরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মতো বিষয় গুরুত্ব পাবে।
ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ও তাঁদের পরিবারের জন্য কী সাহায্য ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, ঘোষিত এককালীন আর্থিক সহায়তা পর্যাপ্ত কি না এবং পুনর্বাসনের জন্য আর কী করা প্রয়োজন, তাও খতিয়ে দেখবে তদন্তকারী দল।
রাজ্য সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, এই নির্দেশ জারির দিন থেকেই SIT গঠনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট ও সুপারিশ জমা দিতে হবে। সেই রিপোর্ট বিবেচনা করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেবে রাজ্য সরকার।