
রাজ্যে বিরোধী নেতাদের লক্ষ্য করে একের পর এক ডিম ছোড়ার বিতর্কে এবার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে তথ্য চাইল কলকাতা হাইকোর্ট। পাশাপাশি এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে গাইডলাইন প্রণয়নের জন্য আদালত পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে সেইসব ঘটনা সম্পর্কে তথ্য আদালতে জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের ওপর হামলা করা হয়েছিল এবং তাঁদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়েছিল। পাশাপাশি, আদালত রাজ্য সরকারকে দায়ের করা এফআইআর-এর সংখ্যা প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছে। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং পার্থ সারথি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ পুলিশ কমিশনারকে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সমস্ত থানার জন্য নির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছে। গৃহীত পদক্ষেপগুলির বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে একটি রিপোর্ট এবং হলফনামা জমা দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই মামলায় পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ২০ জুলাই।
এদিন শুনানির সময় রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল হাইকোর্টে বলেন, রাজ্য সরকার এই পদক্ষেপগুলিকে মোটেই সমর্থন করে না। যেখানেই অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে, পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে। এফআইআর দায়ের করা হবে এবং তদন্ত করা হবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা দুই সপ্তাহের সময় চাই। পুলিশ কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে সে সম্পর্কে রাজ্য সরকার আদালতকে জানাবে। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী বলেন, শুধু ব্যবস্থা নিলেই হবে না, জনসচেতনতা বাড়ানোরও প্রয়োজন আছে। বিচারপতি পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, সকলের জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে, এ ব্যাপারে কোনও শৈথিল্য দেখানো উচিত নয়।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় হাইকোর্টে বলেন, পুলিশ এতে সহায়তা করছে, তারা গণপিটুনিকে উৎসাহিত করছে। অবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করা উচিত, অন্যথায়, পুলিশ ব্যবস্থা নেবে না কারণ রাজ্যের এক মন্ত্রী মানুষকে ডিম ছুঁড়তে উসকানি দিচ্ছেন এবং একজন বিধায়কের উপস্থিতিতে বুলডোজার ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি প্রমাণ করার জন্য আমরা ভিডিও প্রমাণ দেব। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী বলেন, আমরা রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেব, কিন্তু এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করা সম্ভব নয়। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, কোমরে দড়ি বেঁধে হাফপ্যান্ট পরিয়ে লোকজনকে ঘোরানো হচ্ছে। আদালত কি এখনও বিশ্বাস করে যে রাজ্যে আইনের শাসন বিরাজ করছে? রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে বলেন, অভিযোগ দায়ের না করা হলে পুলিশের পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া অসম্ভব। পুলিশ অভিযুক্তদের রক্ষা করছে, তবুও ক্ষুব্ধ জনতা এমন কাজ করছে।
বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী বলেন, পুলিশ কমিশনারের কাছে যদি নির্দেশিকা না থাকে, তাহলে এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আমরা পুলিশ কমিশনারকে সমস্ত থানার জন্য নির্দেশিকা তৈরি করার নির্দেশ দেব যাতে পুলিশ সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারে। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিমানবন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, কেউ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ঘিরে ধরা হয়, ডিম ছোড়া হয় এবং গালিগালাজ করা হয়। প্রসঙ্গত, তৃণমূল নেতাদের উপর হামলা ও ডিম ছোড়ার ঘটনায় দানিশ ফারুকি নামে এক আইনজীবী একটি মামলা দায়ের করেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ মামলাটির শুনানি করছে।
উল্লেখ্য, গত ২২ জুন দায়ের করা এই জনস্বার্থ মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় , মদন মিত্র, কুণাল ঘোষদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ তুলেছিল তৃণমূল। মামলাকারীর দাবি, দলীয় কর্মীদের ওপর আক্রমণ ও কার্যালয় ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি রাজ্যের পালাবদলের পর বিভিন্ন মামলায় ধৃত নেতাদের কোর্টে নিয়ে যাওয়ার সময় বিজেপি কর্মী ও স্থানীয়দের একাংশের বিক্ষোভ এবং ডিম ছোড়ার ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ধৃতদের হেলমেট পরিয়ে নিয়ে যেতেও বাধ্য হচ্ছে পুলিশ। আদালত এই বিষয়ে রাজ্যকে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সেই মামলায় এবার রাজ্যকে গাইডলাইন তৈরি করার নির্দেশ ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির। পাশাপাশি হলফনামা দিয়ে রাজ্য জানাবে কত ঘটনা এরকম ঘটেছে, কী পদক্ষেপ করা হয়েছে।