
নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন, জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ প্রসঙ্গে এমএ বেবির সঙ্গে ফোনালাপ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের প্রতীক-নাম হারিয়ে এখন খরকুটোর খোঁজে। কিন্তু বাম এবং কংগ্রেসও কি BJP বিরোধী আন্দোলনে মমতাকে পাশে চাইছে? বাংলার বদলাতে থাকা রাজনৈতিক সমীকরণে এ প্রশ্ন এখন ঘুরে ফিরে আসছে। এমনকী ভাবনা চলে গিয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে বাম-কংগ্রেস-মমতার জোট নিয়েও। কী ভাবছে এই ৩ শিবির?
চর্চার সূত্রপাত
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং বৈধ ভোটারদের নাম ফেরানোর দাবিতে সরব সমস্ত বিরোধী পক্ষই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য এক্ষেত্রে রঙের বিচার করতেও এখন রাজি নন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, 'CPIM-এর নেতা এমএ বেবি চিঠি লিখেছেন। আমি জবাব দিয়েছি। রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও কথা বলেছি। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে মিটিং হবে। প্রশান্ত ভূষণ, যোগেন্দ্র যাদবরাও আন্দোলনে নেমে পড়েছেন। আমরা মহুয়াকে যন্তর মন্তরে পাঠিয়েছি। কে করছে, কোন রং, কোন পার্টি করেছে দেখব না। বিষয়টি দেখব। মুম্বইয়েও শুরু হয়েছে আন্দোলন। আমরা ঐক্যবদ্ধ ভাবেই লড়াই করব। কে লাল, কে নীল দেখার দরকার নেই।'
তবে কি রাজ্যের বামেরাও মমতার যুক্তিতে একমত?
BJP বিরোধী সব দলকে একজোট করার কথা বলে CPIM-এর সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি চিঠি দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে। দেখা করেছেন অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গেও। পশ্চিমবঙ্গে দুই বিধানসভা উপনির্বাচনের প্রচারের মাঝেই মমতা এবং বেবির পত্রালাপ ও ফোনালাপ হয়েছে। যা নিয়ে চলছে জোর চর্চা।
'বিভ্রান্তি' কাটাতে নেমে পড়েছেন মহম্মদ সেলিম। CPIM-এর রাজ্য সম্পাদক স্পষ্ট করে বলেন, 'মমতা তৃণমূলের সঙ্গে কোনও নির্বাচনী বোঝাপড়া হবে না।' তবে মমতা পরবর্তী BJP জমানায় বামেদের নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার মাঝে এই পত্রালাপ ও ফোনালাপ খানিকটা ছন্দপতন ঘটিয়েছে, তা আলোচিত হয়েছে দলের অন্দরেও। সেলিম যদিও বলছেন, 'দেশের সংবিধান আক্রান্ত, সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশন আক্রান্ত। জ্ঞআনেশ কুমার জ্ঞানত বা অজ্ঞানতাবশত ঘুষের বিনিময়ে বা তাঁর উপরতলার নির্দেশে যে ভাবে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়েছেন, তার প্রতিবাদ করার লক্ষ্যে আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক অ-BJP বিভিন্ন দলকে চিঠি দিয়েছেন। মমতাকেও দিয়েছেন, মমতা জানিয়েছেন তিনি সঙ্গে আছেন। ইন্ডিয়া ব্লকের শরিকরা ইতিমধ্যেই সক্রিয়। তার বাইরের বিরোধী দলগুলিকেও বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তার অর্থ এই নয়, মমতার সঙ্গে আমরা জোট করে ফেলছি।'
পশ্চিমবঙ্গে কি বোঝাপড়া হওয়া সম্ভব?
মহম্মদ সেলিম বলছেন, 'দরুরি অবস্থার মোকাবিলায় অতীতেও জাতীয় স্তরে নানা দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। BJP-র যখন কিছুই নেই এই রাজ্যে, জোট করে লড়ে তাদের সাংসদ, ডেপুটি মেয়র নানা কিছু পাইয়ে দিয়েছিলেন মমতা। সে সব আমরা ভুলিনি। কিন্তু রাজনীতি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। এখন BJP-র বিরুদ্ধে আমরা লড়ছি। রাস্তার আন্দোলনে কাউকে বাধা দেওয়া যায় না। মমতাও রাস্তায় বেরোন, তাঁর কর্মী-সমর্থকদের উজ্জীবিত করুন। এর মানে এই নয়, CPIM তাদের সঙ্গে জোট করতে যাচ্ছে।'
কংগ্রেস মুখপাত্র সুমন রায়চৌধুরী বলেন, 'সংবিধান বাঁচানোর লড়াই চলছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে এই লড়াই ভারতব্যাপী চলছে। BJP বাংলায় ক্ষমতায় আসার পর বিরোধীদের উপর আক্রমণ রাজ্যের মানুষ দেখছেন। এক্ষেত্রে জাতীয় কংগ্রেসের ছাতার তলায় কেউ আসতে চাইলে আসতে পারেন। তবে তার অর্থ আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গে কোনও জোট বা বোঝাপড়া হচ্ছে কি না, সে উত্তর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব দেবেন। জাতীয় কংগ্রেস প্রধান শক্তি যারা ভারতের গণতন্ত্রকে বাঁচাতে পারে। কাউকে যদি এই নিয়ে লড়তে হয় তাহলে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের ছাতার তলাতেই আসতে হবে। মমতা এখন হাত বাড়াচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু যখন উনি শক্তিশালী থাকেন তখন তো ওঁর এই অ্যাপ্রোচ থাকে না, এটা বারবার পরীক্ষিত। তা সত্ত্বেও আমি বলব রাজনীতি সম্ভাবনার শিল্প।'
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কী মতামত?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্র বলেন, 'আমরা বলি ৫ আর ৩-এ কত, উত্তর দিই ৮। আসলে তো অনেকরকম হতে পারে। ৫X৩=১৫ হতে পারে, ৫ এর পাশে ৩ বসিয়ে ৫৩ হতে পারে। ৫-এর পাওয়ারে ৩ বসিয়ে ১২৫ হতে পারে। এটাই হচ্ছে রাজনীতি। অর্থাৎ রাজনীতিতে সবকিছু সরলরৈখিক নয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে সবকিছুই সম্ভাব্য বিষয়। আমরা দেখেছি কংগ্রেসের সঙ্গে CPIM-এর লড়াই ছিল। ভিপি সিংয়ের দু'পাশে একদিকে BJP এবং একদিকে CPIM, তারা কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে সরাল। তারপর ২০০৪-এ UPA সরকার গঠন হল। রাজ্যে CPIM আর কংগ্রেস লড়াই করল কিন্তু কেন্দ্রে একসঙ্গে সরকার গড়ল। এর মধ্যে অস্বাভাবিক কোনও বিষয় নেই।' তাঁর সংযোজন, 'আগামীতে এটা হতেই পারে কংগ্রেস, CPIM, তৃণমূলের একটা অংশ একসঙ্গে হয়ে গেল। তখন দেখতে হবে কে তার থেকে লাভ করবে, কার ক্ষতি হবে। এই মুহূর্তে তৃণমূল যেভাবে ভেঙে গিয়েছে। সেই ভোটগুলি তো কংগ্রেস এবং CPIM-এর পাওয়ার কথা। এবার তারা সেই তৃণমূলের সঙ্গে কথা বললে ভোট পাবে না কথা না বললে ভোট পাবে সেটা দেখতে হবে। আগের থেকে বোঝা খুব একটা সম্ভব নয় রাজনীতিতে, চর্চা চলে। দোষের কিছু নেই, মতামত নিজেদের মধ্যে আদানপ্রদান করতেই পারেন। আমাদের নজর রাখতে হবে।'