
বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়াতে যেসব নেতা-নেত্রীকে দেখা গিয়েছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। জুনের শুরুতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলের রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব দেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে। তৃণমূল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত দলের রাজ্য সভাপতির পদ সামলে এসেছেন সুব্রত বক্সি। তাঁকে সরিয়েই নতুন রাজ্য সভাপতি করা হয়েছে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে। সেই চন্দ্রিমার ছেলে তথা কলকাতা পুরসভার ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৌরভ বসুকে সোমবার দেখা গেল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠকে অংশ নিতে। এই ছবি সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে চন্দ্রিমার ছেলেও কি তাহলে বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন?
সোমবার নিউটাউনের হোটেলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় পন্থীদের বৈঠকে দেখা গিয়েছে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুব কাছের চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের ছেলে সৌরভ বসুকে৷ এই প্রসঙ্গে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্য়ায় সাংবাদিক বৈঠক চলাকালীন বলেন, 'আমি একটা কথা বলতে পারি অনেকটা মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো। সৌরভ বসু একজন ব্যক্তি। তিনি কার ছেলে, কার নাতি, এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি কলকাতা পুরসভার একজন গুরুত্বপূর্ণ কাউন্সিলর। জনপ্রিয় কাউন্সিলর। আমাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। নিশ্চিতভাবে আগামী দিনের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।' সৌরভ বসু ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিদায়ী তৃণমূল কাউন্সিলর। ২০২১ সালে ৩ হাজার ৮৮৩ ভোটে জিতেছিলেন সৌরভ বসু। পাশাপাশি তিনি পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল যুব কংগ্রেসের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক। সৌরভ বসুর সোমবারের বিদ্রোহী শিবিরে উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। এরআগে পুরসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর 'স্বচ্ছতার সঙ্গে স্বাগত' কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছিলেন সৌরভ। এই প্রসঙ্গে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে ফোন করা হলে তিনি bangla.aajtak.in-কে জানান, 'এটা ওঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, আমি হস্তক্ষেপ করিনি।'
প্রসঙ্গত কয়েকদিন আগেই বিদ্রোহী হন সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পুত্র বৈদ্যনাথ ঘোষ দস্তিদার। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন। বিয়েতে দেওয়া মমতার উপহার ফেরতের সিদ্ধান্তও নেন তিনি। কাকলি-পুত্র বৈদ্যনাথ ঘোষ জানিয়েছিলেন, 'বিয়েতে আমার স্ত্রীকে দেওয়া মমতার সোনার হার ও দুর্গাপুজোয় আমাকে দেওয়া কুর্তা-পাজামা ফেরত দিচ্ছি। এই সৌজন্যের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। ব্যক্তিগত কারণে এই উপহারগুলি ফিরিয়ে দেওয়াই সমীচীন।'
প্রসঙ্গত, পাঁচতারা হোটেলে ঋতব্রত তৃণমূলের পক্ষ থেকে সোমবাপ আয়োজন করা হয়েছিল স্পেশাল সেশন বা বিশেষ অধিবেশনের। তৃণমূলের বিদায়ী বোর্ডের একগুচ্ছ কাউন্সিলর হাজির হন এই গোপন বৈঠকে। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় মমতা ও অভিষেককে সরিয়ে নয়া কমিটি গঠনের। যে স্পেশাল সেশন ডাকা হয়েছিল, তার ব্যানারই যাবতীয় উত্তর দিয়ে দেয়। ওই ব্যানারে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস লেখা থাকলেও, ছিল না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। বরং ছিলেন বি আর আম্বেদকর, মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলাম। ৩০ মিনিটের ‘স্পেশাল সেশন’ হয়। তাতে হাজির ছিলেন তৃণমূলের বিদ্রোহী ব্লকের ৬০ জনের বেশি বিধায়ক। এছাড়াও বাসে চাপিয়ে নিউটাউনের ওই হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কলকাতা পুরসভার ৬০-৬৫ জন কাউন্সিলারকে। বিশেষ বৈঠকে হাজির ছিলেন পাহাড় থেকে সাগর পর্যন্ত রাজ্যের প্রত্যেকটি জেলার তৃণমূল নেতারা।
ওই বৈঠকেই জাতীয় কর্ম সমিতি গঠন করে মমতা-অভিষেককে পুরোপুরি বাদ দিয়েছে ঋতব্রতর তৃণমূল। ৩০ জনের ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। সহ সভাপতি হয়েছেন ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ এবং সাবিনা ইয়াসমিন। কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে। উল্লেখ্য, ফিরহাদ হাকিম ও অরূপ বিশ্বাস ছিলেন মমতার প্রধান দুই রাজনৈতিক সঙ্গী। এদিন দু’জনই সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় উপস্থিত ছিলেন। ঋতব্রত দাবি করেন, ‘আমরাই তো তৃণমূল কংগ্রেস। নিয়ম মেনেই কমিটি গঠন করেছি। তা আমরা নির্বাচন কমিশনকে জানাব। আগামী দিনে কলকাতায় পার্টি অফিস হবে। আর তৃণমূলের অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত করা হোক।’ এদিকে নতুন কমিটি গঠন করার খবর সামনে আসার পরে ফিরহাদ-অরূপ বিশ্বাস সহ আটজনকে শো’কজ করে মমতা তৃণমূলের কমিটি। সূত্রের খবর, সোমবার দলের বৈঠকে মমতা বলেছেন, ‘যাঁরা দলের সঙ্গে বৈইমানি করেছেন, তাঁরা বেরিয়ে যাক। আমি নতুনভাবে দল সাজাব।’