
সপ্তমীর সন্ধ্যেতেই নেমে এল ভয়াবহ বিপর্যয়। উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনে পদপিষ্টের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যুতে গোটা শহর থম মেরে গিয়েছে। অসুস্থ ২৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শনিবার হঠাৎ করে নামা বৃষ্টি কাল হয়ে দাঁড়াল চোরবাগান সর্বজনীনে। হুড়োহুড়িতে পদপিষ্টের মতো ঘটনা ফিরিয়ে আনল কয়েক বছর আগের দেশপ্রিয় পার্কের বড়দুর্গার সেই ঘটনাটি। চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোর শিল্পী ছিলেন সুশান্ত শিবানী পাল। তাঁরই পরিকল্পনায় সেজে উঠেছিল মণ্ডপ। সেখানেই সপ্তমীর রাতে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা, কেনই বা ঘটল? bangla.aajtak.in-কে শিল্পী জানালেন গোটা পরিস্থিতির কথা।
শিল্পী বলেন, 'অত্যাধিক মানুষের চাহিদা এই পুজোটাকে দেখার জন্য এই ঘটনা ঘটেছে। আমি শুক্রবার রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ ওখান থেকে বেরিয়েছে, সেই সময়ও কলকাতা পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা ছিলেন এবং তারা সেই সময় আলোচনাও করছিলেন। আশঙ্কা করেছিলেন এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটতে পারে। সেই কারণে লালবাজার থেকে পুজোর ক্যামেরা ফুটেজও নেওয়া হয়।' সুশান্ত পাল বলেন, 'শুক্রবার সন্ধে থেকেই দর্শনার্থীরা বলছিলেন যে ভেতরে আলো কম। থিমটাকে মাথায় রেখে আলোটা একটু কম রাখা হয়েছিল। তবে প্রথমা ও দ্বিতীয়াতে আলোর যে ব্যবস্থা ছিল, শুক্রবার দুপুরের পর থেকে টেম্পোরারি লাইট যেটা মণ্ডপের ভেতরে লাগানো ছিল, মেটাল এবং হ্যালোজিন, সেগুলো সব জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আমি নিজে গিয়েই থিমটা বুঝতে পারিনি, কারণ মণ্ডপের ভেতরে প্রতিটা জায়গা পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে, দর্শকদের জন্যই করতে হয়েছে। তারপরও ভিড় আটকানো যাচ্ছিল না, সকলেই মোবাইলে ছবি তুলছেন, সকলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করবেন', বলেন শিল্পী।
সুশান্ত শিবানী পাল বলেন, 'ওটা করতে গিয়ে আমাদের যে যাত্রাপথটা ছিল, সেটা প্রথমে ওপর থেকে ঠাকুরটাকে দেখা যাচ্ছিল আর তারপর নীচে নেমে প্রতিমাটাকে দেখা যাচ্ছিল। এরপর পুলিশ বলে যে ওপর থেকে আর দেখানো যাবে না, ওখানে ঢাকা দিয়ে দিতে হবে। পুলিশের কথানুযায়ী কর্মকর্তারা আমায় ফোন করে এবং আমি ডেকরের্টাসদের বলে ওখানে কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা দিই। এতে ওপর থেকে ঠাকুর দেখা বন্ধ হয়ে গেল। দর্শনার্থীরা নীচ থেকে ঠাকুর দেখে গেট দিয়ে বেরিয়ে যাবে। সবই ঠিকঠাক চলছিল।' শিল্পীর কথায়, 'শনিবার সন্ধেতে আচমকা বৃষ্টি নামার ফলে মণ্ডপের ভেতরে যে সংখ্যক মানুষ ছিলেন তাঁরা বের হতে পারেনি, বাইরে সেই সময় যে দুটো লাইনে মানুষ ছিল তারা অপেক্ষা করছিলেন ভেতরে যাওয়ার জন্য। তারা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে জোর করে মণ্ডপের ভেতরে ঢুকে যায়, সেই সময়ই এই হুড়োহুড়ির সূত্রপাত। এরপর তারা যখন বেরোতে যায়, সেখানেই পদপিষ্টের মতো ঘটনা ঘটে। ভিড় এতটাই ছিল যে একটা লাইন চলে গেছে গিরিশ পার্ক মেট্রো পর্যন্ত আর একটা লাইন মহাজাতি সদন পেরিয়ে চলে গেছে। দু'দিক থেকেই ভিড় আসছে, চোরবাগানে ঢোকার জন্য। এক একজন দুঘণ্টা তিনঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে পুজো দেখছে। সাধারণত সন্ধের দিকে ভিড় হলেও রাতের দিকে কিছুটা থিতু হয়। সকালে তো ভিড়ই হয়না। কিন্তু এই বছর চোরবাগানে সকাল, সন্ধে ও রাতে একই ধরনের ঢল দেখতে পাওয়া যায়। পুলিশ যথেষ্ট সহায়তা করেছে ভিড় নিয়ন্ত্রণে।'
এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটায় শিল্পী হিসাবে প্রচণ্ড খারাপ লাগছে সুশান্ত পালের। তিনি বলেন, 'আমি তো ২৮ বছর ধরে পুজোর কাজ করছি, এ বছর নিয়ে ৬০টি পুজো করছি। আমরা এটা কেউই চাইনা, আমরা চাই মানুষ এসে শিল্পটা উপভোগ করুক। মানুষ শিল্প দেখতে এসে প্রাণ হারাচ্ছে, এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী আছে। দুর্গাপুজো যেভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে গোটা বিশ্বের কাছে, এটা তো মনে হয় কালো দিন।'