
অবশেষে গ্রেফতার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ি থেকেই গ্রেফতার করা হয় সুমিতকে। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট তাঁর রক্ষাকবচ বাতিল করতেই ময়দানে নেমে পড়ে সিআইডি ও এসটিএফ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ি ও সুমিতের রায়ের বাড়ি ঘিরে ফেলে সিআইডি ও এসটিএফ। শেষপর্যন্ত অভিষেকের বাড়ি থেকেই গ্রেফতার করা হয় সুমিত রায়কে।
শালবনি জমি দুর্নীতি মামলাতেই গ্রেফতার করা হল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ককে। এর পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ভবানীভবনে। সুমিতের গ্রেফতারি প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, 'প্রসিদ্ধ তোলাবাজ সুমিত রায় গ্রেফতার হয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টে রক্ষাকবচ বাতিল হওয়ায় কালীঘাটে তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১২১, কালীঘাট রোড থেকে তাঁকে রাজ্য পুলিশের সিআইডি গ্রেফতার করেছে।'
কীভাবে ঘনিষ্ঠতা অভিষেক-সুমিতের
তৃণমূলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা অভিষেকের সঙ্গে এই সুমিতের যোগাযোগ ছোটবেলা থেকেই। স্কুলের বন্ধু দু’জনে। সেই বাল্যবেলার বন্ধুই হয়ে উঠেছিলেন অভিষেকের আপ্তসহায়ক। দক্ষিণ কলকাতার নবনালন্দা স্কুলে পড়তেন অভিষেক। সুমিতও অভিষেকের সহপাঠী ছিলেন স্কুলে। অভিষেক এখানে পড়াশোনার পরে দিল্লিতে চলে যান। তবে সুমিতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থেকে গিয়েছিল। রাজ্য সক্রিয় রাজনীতিতে অভিষেকের আবির্ভাব হয় তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে। ২০১১ সালের ২১ জুলাই রাজনীতিতে আগমন হয় তাঁর। তৈরি হয় যুবা। তার মাথায় বসানো হয় অভিষেককে। সেই থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে ধীরে ধীরে উত্থান শুরু হয় অভিষেকের। হয়ে ওঠেন ‘যুবনেতা’ অভিষেক। এই উত্থানের সময়ে অভিষেকের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বেশ কয়েকটি স্তর ছিল। সেই স্তরে অভিষেকের থেকে একটু দূরে চলে গিয়েছিলেন সুমিত। বৃত্তের মধ্যেই ছিলেন, তবে একটু দূরে।
সুমিত ও রাজনীতি
তৎকালীন সময়ে অভিষেকের সবচেয়ে কাছের বৃত্তে ছিলেন কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি, যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিনয় মিশ্র। সুমিতের অবস্থান ছিল তারও পরের স্তরে। পরবর্তীতে কয়লাপাচার মামলায় বিনয় মিশ্রের নাম জড়িয়ে পড়ায় তিনি ধীরে ধীরে অভিষেকের ঘনিষ্ঠ মহল থেকে সরে যান। ফলে অভিষেকের ঘনিষ্ঠ বলয়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেই সময়েই সুমিত ক্রমশ তাঁর আরও কাছাকাছি চলে আসেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে সুমিতের প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে তৃণমূলের অন্দরে। যা আরও গতি পায় ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে। একটি পর্যায়ে সুমিতই হয়ে ওঠেন সংগঠন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন নজরদারি চালানোর ক্ষেত্রে অভিষেকের চোখ এবং কান। অভিষেকের সংসদীয় এলাকায় ডায়মন্ড হারবারের কাজকর্ম দেখা, জেলা সংগঠনগুলির সঙ্গে ক্যামাক স্ট্রিটের সমন্বয়, আইপ্যাকের রিপোর্টের ভিত্তিতে সাংগঠনিক রদবদলের ক্ষেত্রে নেতাদের কাজকর্মের জরিপ করা— এই সবই করতেন সুমিতই।
শালবনি কেসে গ্রেফতার সুমিত
শালবনিতে জমি দুর্নীতি মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত সুমিত। কিছুদিন আগেই মেদিনীপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরাকে খড়্গপুর স্টেশন থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ৷ মূলত জমি কেলেঙ্কারির অভিযোগেই গ্রেফতার হন প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক৷ অভিযোগ, প্রায় ৭০ একর (আনুমানিক ২০০ বিঘা) সরকারি জমি ভুয়ো দলিল, রেকর্ড বানিয়ে অবৈধভাবে বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মেদিনীপুরের প্রাক্তন বিধায়ক৷ মেদিনীপুর থেকে গড়বেতা যাওয়ার রাস্তার পাশে শালবনি এলাকায় এই বিরাট পরিমাণ সরকারি জমি ভুয়ো দলিল কাগজপত্র বানিয়ে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ। সুজয় হাজরার পাশাপাশি আরও এক সদ্য প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক এবং তাঁর আত্মীয়দের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে৷ প্রাক্তন বিধায়ক সুজয় হাজরাকে জেরাতেই সুমিত রায়ের নাম উঠে আসে৷
কীভাবে গ্রেফতার সুমিত?
ওই মামলায় তাঁর আগাম জামিনের আবেদন হাইকোর্ট খারিজ করে দিয়েছিল। তার পরে সুপ্রিম কোর্টে যান সুমিত। বুধবার মামলাটির শুনানি হয় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে। বুধবার রাজ্যের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি জানান, গত জুনে সুমিতের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৭১ লক্ষ টাকা জমা পড়েছে। মোট প্রায় ১৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে অভিষেকের আপ্তসহায়কের অ্যাকাউন্টে। এই টাকার উৎস কী, তা নিয়ে সন্দেহপ্রকাশ করেন তদন্তকারীরা। তাই অভিষেকের আপ্তসহায়কের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে বলে সওয়াল করা হয়। সুমিতের হয়ে সওয়াল করেন তাঁর আইনজীবী গোপালশঙ্কর নারায়ণ এবং অয়ন ভট্টাচার্য। প্রসঙ্গত, জমি দুর্নীতি মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়ের রক্ষাকবচ মামলায় বুধবার সুপ্রিম কোর্টে একাধিক অভিযোগ তুলেছিল রাজ্য। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তর এজলাসে মামলার শুনানিতে রাজ্যের আইনজীবী তথা সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে অভিযোগ করেছিলেন, একাধিক সরকারি জমি অন্য ব্যক্তির নামে মিউটেশন করিয়ে বিক্রি করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রয়েছে সুমিতের। তদন্তে জমির দালালরা সুমিতের নাম বলেছেন। বিভিন্ন সময়ে খেপে খেপে সুমিত তাঁর অ্যাকাউন্টে ১৫ কোটি টাকা জমা করেছেন। ব্যাঙ্কের সেই স্লিপও আছে বলে আদালতে দাবি করেন সলিসিটর জেনারেল। এরপরই তুষার মেহতা আদালতে দাবি করে, সুমিত রায়ের বিভিন্ন নথিতে তাঁর পদবীর ইংরেজি বানান আলাদা আলাদা। সলিসিটর জেনারেল অভিযোগ করেন পদবীর দুই রকম বানান দেখিয়ে সুমিত দাবি করছেন দুই ব্যক্তি এক নয়। এই অজুহাতে তদন্তকারীদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। সেই কারণে সুমিতকে হেফাজতে নিয়ে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন জানান তিনি। এদিন শীর্ষ আদালতের সিদ্ধান্তের পরই তার বাড়িতে পৌঁছে যায় সিআইডি এবং এসটিএফ। তারা চারিদিক থেকে বাড়িটি ঘিরে ফেলেন। পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িও ঘিরে ফেলে সিআইডি এবং এসটিএফ। এরপরই অভিষেকের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয় সুমিত রায়কে।