
বর্ষাকালে জল নিয়ে ভীষণ সতর্ক থাকুন। এমনই পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকেরা। রিসার্চ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগামিদিনে কলকাতায় কলেরার প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘ মেয়াদে, চলতি শতাব্দীর শেষ দিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কলকাতায় কলেরার আক্রান্তের সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় ৮১ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। শুধু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়াই নয়, গরমকাল ও বর্ষায় কলেরার যে আলাদা দু’টি প্রকোপ দেখা যায়, ভবিষ্যতে সেই ব্যবধানও কমে যেতে পারে।
এই গবেষণাটি করেছে University of Exeter এবং Indian Council of Medical Research (ICMR)-এর গবেষকেরা। কলকাতার দীর্ঘ সময়ের কলেরা সংক্রান্ত তথ্য এবং ভবিষ্যতের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের হিসাব মিলিয়ে একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করেছেন তাঁরা। গবেষণায় কলকাতায় ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কলেরার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
গরম বাড়লেই কেন কলেরার ঝুঁকি বাড়ে?
কলেরা মূলত Vibrio cholerae নামে একটি ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এই ব্যাকটেরিয়া উষ্ণ জলীয় পরিবেশে সহজে বেঁচে থাকতে ও বাড়তে পারে। ফলে তাপমাত্রা বাড়লে জলাশয় বা দূষিত জলে এই ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে।
কলকাতায় সাধারণত কলেরার প্রকোপের দু’টি সময় দেখা যায়। গরমকালে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় জলে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাড়তে পারে। এর পর আসে বর্ষা। প্রবল বৃষ্টিতে অনেক জায়গায় জল জমে যায়, নিকাশি ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়। নোংরা জল এবং পানীয় জল মিশে গেলে দূষিত জলের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনাও বাড়ে। সেখান থেকেই ছড়াতে পারে কলেরা।
অর্থাৎ, গরম এবং অতিরিক্ত বৃষ্টি, দু’ভাবেই কলেরার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
২০৮০-৯৯ সালেকলেরা কতটা বাড়তে পারে?
গবেষকেরা ২০৮০ থেকে ২০৯৯ সালের বিভিন্ন জলবায়ু পরিস্থিতি ধরে হিসাব করেছেন। সেই পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে আশাবাদী জলবায়ু পরিস্থিতিতেও কলকাতায় কলেরার প্রকোপ গড়ে ৮১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
আর জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হলে এই বৃদ্ধি ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে মডেল জানিয়েছে।
তবে এটি কোনও নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। এটি জলবায়ু এবং রোগ ছড়ানোর বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি একটি বৈজ্ঞানিক মডেলের পূর্বাভাস। বাস্তবে কলেরার প্রকোপ নির্ভর করবে পানীয় জলের মান, নিকাশি ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, মানুষের আচরণ এবং স্থানীয় দূষণের মতো আরও অনেক বিষয়ের উপর।
বর্ষায় জল নিয়ে এত সতর্ক কেন?
গবেষণায় বৃষ্টিপাতকেও কলেরার ঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রবল বৃষ্টিতে শহরের নিকাশি ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে। কোথাও কোথাও নোংরা জল ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেই জল যদি পানীয় জলের উৎসের সঙ্গে মিশে যায়, তখন বিপদ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে ফুটপাথের খাবার, অপরিশোধিত জল বা অপরিষ্কার হাতে খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। বর্ষাকালে জল ফুটিয়ে বা নিরাপদ উৎসের জল পান করা, খাবার ঢেকে রাখা এবং শৌচাগার ব্যবহারের পর ও খাবার খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মতো সাধারণ অভ্যাস কলেরার মতো জলবাহিত রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
ভবিষ্যতে দুই দফার বদলে প্রায় সারাবছরই?
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কলেরার মরসুমের পরিবর্তন।
এখন কলকাতায় গরমকাল এবং বর্ষাকালে কলেরার প্রকোপের দু’টি আলাদা সময় দেখা যায়। কিন্তু পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে এই দু’টি সময়ের মধ্যে ব্যবধান কমে যেতে পারে। অর্থাৎ, একটি প্রকোপ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী প্রকোপ শুরু হওয়ার সময় কমে যাবে।
গবেষকদের মডেল বলছে, ভবিষ্যতে কলেরার প্রকোপ আরও আগে শুরু হতে পারে এবং শরৎকালেও সংক্রমণের মাত্রা বেশি থাকতে পারে। ফলে স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি প্রকোপ সামলানোর পর আরেকটির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ও কমে যেতে পারে।
শুধু তাপমাত্রা নয়, বৃষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণায় চার ধরনের গাণিতিক মডেল পরীক্ষা করা হয়েছিল। তার মধ্যে যে মডেলটি তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাত; দু’টিকেই বিবেচনায় নিয়েছিল, সেটি কলকাতার অতীতের কলেরার মরসুমের সঙ্গে সবচেয়ে ভাল মিল দেখিয়েছে।
গবেষকেরা দেখেছেন, শুধু তাপমাত্রা দিয়ে ভবিষ্যতের কলেরার প্রকোপ বোঝা সম্ভব নয়। জল কতটা জমছে, মানুষের দূষিত জলের সংস্পর্শ কতটা বাড়ছে এবং ব্যাকটেরিয়া পরিবেশে কী ভাবে বাড়ছে; এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বাস্তবে কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় হঠাৎ পানীয় জলে দূষণ ছড়িয়ে পড়লে আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটা বেড়ে যেতে পারে। এই ধরনের স্থানীয় ঘটনা সব সময় জলবায়ু মডেলে সঠিক ভাবে ধরা সম্ভব নয়।
এখন থেকেই কী করা দরকার?
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে কলেরার ঝুঁকি কমাতে এখন থেকেই জল, নিকাশি এবং স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। শহরে বৃষ্টির জল দ্রুত বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা, পানীয় জলের উৎস সুরক্ষিত রাখা এবং বন্যার সময় নোংরা জল যাতে পানীয় জলের সঙ্গে না মেশে, সে দিকে নজর দিতে হবে।
কলেরার বিরুদ্ধে টিকাকরণও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে রোগের মরসুম যদি দীর্ঘ হয়ে যায়, তখন শুধু নির্দিষ্ট সময়ে টিকা দেওয়ার বর্তমান কৌশল যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু গরম বাড়াচ্ছে না; এর প্রভাব সংক্রামক রোগের উপরও পড়তে পারে। কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে নিরাপদ পানীয় জল এবং উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা তাই আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তাই বর্ষায় অপরিষ্কার বা যেখানে-সেখানে জল পান করবেন না, জল ফুটিয়ে বা নিরাপদ জল পান করুন, খাবার ভাল করে ঢেকে রাখুন এবং হাত পরিষ্কার রাখুন।