
চোরবাগানের পুজোয় মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তারপর ধীরে ধীরে শিফট করা হয় বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। আর এই ব্যাপারটা নিয়ে সরব হয়েছিলেন মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তারদের একাংশ। সেই সময় প্রেস কনফারেন্স করেছিলেন তাঁরা। আর এই ঘটনা নিয়েই বেজায় ক্ষুদ্ধ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানতে চেয়েছেন, যাঁরা প্রেসে স্টেটমেন্ট দিয়েছেন, তাঁদের ডিউটি ছিল কি না। থাকলে সেই মতো ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিই দিয়েছেন তিনি। আর মুখ্যমন্ত্রীর এই বিবৃতির পরই শুরু হয়ে গিয়েছে বিতর্ক। চিকিৎসকদের একাংশ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করছে। আবার মুখ্যমন্ত্রীকে সমর্থন করছে এনএমও।
কী বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী?
মেডিক্যাল কলেজে জুনিয়র ডাক্তারদের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, 'আমাদের মেডিক্যাল কলেজের যাঁরা ডিউটি ছেড়ে স্টেটমেন্ট দিয়েছে নেতার মতো, স্বাস্থ্যমন্ত্রী-স্বাস্থ্য সচিবকে বলেছি, ছবিগুলো দেখে আইডেন্টিফাই করে বের করতে, ওদের ওই সময় ডিউটি ছিল কি না। রিপোর্ট সিএমও-তে দিতে হবে৷ যদি ডিউটি চলাকালীন বেরিয়ে এসে স্টেটমেন্ট দিয়ে থাকে, তাহলে প্রতিহিংসা নয়, এটা কিন্তু সার্ভিস রুলের পরিপন্থী৷ এই সার্ভিসটা হচ্ছে এমার্জেন্সি সার্ভিস। একটা মানবিকতা দায়বদ্ধতা রয়েছে৷ আমি বিতর্কে যেতে চাই না৷'
আর মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিয়েই একাধিক চিকিৎসক সরব হয়েছেন। তাঁদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন যে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পরিকাঠামো নেই। সেই কথাই জুনিয়র ডাক্তাররা বলেছেন। এতে সমস্যার কিছু নেই। বরং ঘটনার সময় জুনিয়র ডাক্তারদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যই প্রাণ বেঁচেছে অনেকের।
বিষয়টা নিয়ে মুখ খুলেছেন আরজি কর ও থ্রেট কালচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম মুখ অনিকেত মাহাতো। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি বলেন, 'সেই দিন যা যা করার দরকার ছিল, তাঁরা তাই করেছে। প্রয়োজন ছিল তাঁদের কুর্নিশ জানানোর। শুভেচ্ছা জানানোর। কিন্তু উল্টে দেখলাম তিনি তালিকা ডাকছেন। জুনিয়র ডাক্তারদের কথায় তিনি রুষ্ঠ হয়েছেন। অন্যায়ের সবসময়ই প্রতিবাদ করা উচিত। মুখ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন, বেসরকারি হাসপাতালে কী এমন চিকিৎসা পেলেন, যেটা মেডিক্যাল কলেজে দেওয়া যেত না?'
অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টরসের সম্পাদক ডা: উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'ওই ঘটনার পর আহত অবস্থায় যাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাঁদের প্রথম ঘণ্টায় চিকিৎসা করেছে জুনিয়র ডাক্তাররা। ওটাই ছিল গোল্ডেন আওয়ার। এরপর আর আহত একটি মানুষেরও মৃত্যু হয়নি। আমরা এটা পরবর্তীকালে জেনেছি যে তাঁদের মধ্যে একজনকে ছাড়া বাকি সবাইকেই আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে ওই বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাহলে তাঁরা যদি এই প্রথম ঘণ্টায় সঠিক চিকিৎসা না করতো, তাহলে এঁরা এতো তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে পারতো না।'
তাই তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে এই চিকিৎসক এবং জুনিয়ার ডাক্তারদের ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানানো দরকার। তিনি বলেন, 'তাঁরা কোনও অপরাধ করেছেন বলে কোথাও আমাদের মনে হচ্ছে না। তাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন বলেই আমাদের এতোগুলি সহনাগরিকের মৃত্যুর মিছিলটাকে এড়ানো গিয়েছে। আমি আমাদের সরকারের কাছে আবেদন করব যে আপনারা আমাদের এই চিকিৎসক এবং জুনিয়র ডাক্তারদের ধন্যবাদ জানান।'
যদিও এই বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে এনএমও-এর। তাদের পক্ষ থেকে সভাপতি ডা: রুদ্রনীল নন্দী বলেন, 'তখন একটা এমার্জেন্সি চলছিল। সেই এমার্জেন্সি চলাকালীন ডিউটি থেকে বেরিয়ে এসে রাজনীতির কথা বলা যায় না। এবারে কারা কী করেছে, কারা তাদের মধ্যে অন-ডিউটি ছিল, সরকার সেটা তদন্ত করুন। সেটাতে যা ফল হবে সেটা সরকারের ব্যাপার। এতে আমাদের বক্তব্য কিছু নেই। কিন্তু নীতিগতভাবে আমরা একটা জিনিস বিশ্বাস করি, ডাক্তারদের সামনে যখন একটা এমার্জেন্সি অবস্থা রয়েছে, তখন এসব কথা বলা যায় না। পরিকাঠামোগত সমস্যা থাকলে পরে বলা যেতে পারত।'