
বর্ষাকালে মরসুমি সংক্রমণের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতায় ফের কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে কোভিড-১৯ সংক্রমণ। তবে চিকিৎসকদের আশ্বাস, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০২০ বা ২০২১ সালের ভয়াবহ কোভিড পরিস্থিতির কোনও মিল নেই। এখন অধিকাংশ সংক্রমণই মৃদু এবং সাধারণ মরসুমি ফ্লু-এর মতো উপসর্গ নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে।
চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে আক্রান্তদের মধ্যে মূলত জ্বর, গলা ব্যথা, কাশি, শরীর ব্যথা, সর্দি বা নাক দিয়ে জল পড়ার মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগ রোগী বাড়িতেই আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠছেন। এমনকি হালকা উপসর্গ থাকলে অনেকেই আর কোভিড পরীক্ষাও করাচ্ছেন না।
মুকুন্দপুরের নারায়ণা আরএন টেগোর হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের পরামর্শক ডা. যুদ্ধজিৎ সেনগুপ্ত সংবাদমাধ্যমকে বলেন, 'সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কোভিড সংক্রমণের ঘটনা সামনে এলেও আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। এখন কোভিড অনেকটাই মরসুমি ফ্লু-এর মতো আচরণ করছে।'
চিকিৎসকদের দাবি, কোভিড মোকাবিলায় হাসপাতালগুলির প্রস্তুতি সম্পূর্ণ রয়েছে। মৃদু সংক্রমণের ক্ষেত্রে বাড়িতে আইসোলেশনে থেকে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন, অ্যান্টিভাইরাল ও স্টেরয়েডের মতো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
কলকাতার ফোর্টিস হাসপাতালের পালমোনোলজিস্ট ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ ডা. শুভজিৎ সেন জানান, বর্তমানে তাঁদের হাসপাতালে তিনজন কোভিড রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। অন্য দু'জনের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় আইসিইউ-তে ভর্তি করতে হয়েছিল। তবে চিকিৎসায় তাঁরা ভাল সাড়া দিয়েছেন এবং এখন স্থিতিশীল রয়েছেন।
ডা. সেনের মতে, বর্তমান সংক্রমণের ধরন অনেকটাই ওমিক্রন ঢেউয়ের মতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংক্রমণ শ্বাসনালীর উপরের অংশে সীমাবদ্ধ থাকছে। তবে বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাঁদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা অন্যান্য শারীরিক জটিলতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
কলকাতার জেনারেল ফিজিশিয়ান ডা. দেবদীপ দত্ত জানান, বর্ষাকালে কোভিডের পাশাপাশি ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া-সহ অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণও বাড়ে। তাই বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
তাঁর পরামর্শ, ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, ডায়াবেটিস, হাঁপানি, যক্ষ্মা, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিংবা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড খাচ্ছেন, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এক সপ্তাহের বেশি জ্বর, শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া বা ত্বকে র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সাউদার্ন অ্যাভিনিউয়ের এএম মেডিকেল সেন্টারের জেনারেল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সৌরিত সিনহাও একই পরামর্শ দিয়েছেন। একটি সংবাদমাধ্যমকে তাঁর কথায়, বয়স্ক মানুষ, সহ-রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা জরুরি। প্রথমে সাধারণ সর্দি-কাশি মনে হলেও যদি উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হয় বা অবস্থার অবনতি ঘটে, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
চিকিৎসকদের মতে, সংক্রমণ এড়াতে নিয়মিত হাত ধোয়া, জনসমাগমে মাস্ক ব্যবহার করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং অসুস্থ হলে বাড়িতে বিশ্রাম নেওয়ার মতো সাধারণ স্বাস্থ্যবিধিই সবচেয়ে কার্যকর।
ডা. দেবদীপ দত্ত আরও বলেন, 'বর্তমানে কোভিড পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। ব্যাপক ভ্যাকসিন কর্মসূচি এবং উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার ফলে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত।'