
কোথাও ভাঙচুর, কোথাও বই পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ এসেছিল। এ বারের দুর্গাপুজোয় বামেদের বুকস্টল ছিল খবরের শিরোনামে। আর সেই বুকস্টলই ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে আলিমুদ্দিনকে। হিসেব বলছে, এ বছর ৪ গুণ বেড়েছে বামেদের বই বিক্রি। তবে কি এটা বাড়তি মাইলেজ দেবে লাল শিবিরকে?
প্রতি বছরের মতো এ বছরও যাদবপুরে বই বিপণী উদ্বোধন হয় বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর হাতে। গান বাজনা, দেদার আড্ডা, বই বিক্রির মাঝেই চরম সংঘাতের আবহ তৈরি হয় এই স্টলকে কেন্দ্র করে। পৌঁছে যায় পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী, এমনকী বুলডোজারও। সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাম কর্মীরা বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে ভাঙচুর আটকান। সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। নিন্দার ঝড় ওঠে। সমালোচিত হয় প্রশাসন, এমনকী শাসকদেলর নেতা-বিধায়কও বইয়ের স্টল ভাঙচুরের তীব্র নিন্দা করেন।
আর তারপরই দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় ৪ গুণ বেশি বই বিক্রি হয়েছে এ বার। শুধুমাত্র যাদবপুররের মার্ক্সীয় সাহিত্যের এই পুস্তক বিপণী থেকে বিক্রি হয়েছে ১৬ লক্ষ ২ হাজার ৪৯৮ টাকার বই। যা গত বছর ছিল সাড়ে ৪ লক্ষ।
নাগেরবাজার থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত এ বার বিভিন্ন জায়গায় বামেদের বই বিপণিতে হামলার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। গোটা রাজ্যে কমবেশি ১০০টি স্টলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বই ছুড়ে ফেলা বা জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। তার পরে ১৫-২০টি স্টল আর খোলা যায়নি। কিন্তু বাকি ৮০-৮৫টি স্টল ফের বসেছে। কোথাও কোথাও ভ্রাম্যমান বুকস্টলও করেছে বামেরা। টোটো বা ভ্যানে করে বই নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বিক্রি করেছেন দলের নেতাকর্মীরা।
নাগেরবাজারের একটি বুকস্টলের ভিডিও ভাইরাল হয়। দেখা যাচ্ছে, এক তরুণ প্রবল আগ্রাসী হয়ে বামেদের বুকস্টলে রাখা বই ছুড়ে ফেলছে মাটিতে। আর ফতুয়া-পাজামা পরা এক বৃদ্ধ তাঁকে ততোধিক নম্রতায় বোঝানোর চেষ্টা করছেন, এই বইগুলি চিরায়ত। তিনি যেন পাতা উল্টে দেখেন। মাটিতে আছাড় খায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’।
তবে কি এই ধরনের ঘটনাগুলি বামেদের এ বার বাড়তি মাইলেজ দিল? বাম নেতা সুদীপ সেনগুপ্ত বলেন, 'মানুষ প্রতিবাদ করেছে ওদের নিদানের বিরুদ্ধে। মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলেছে ওদের তালিবানি ফতোয়া মানব না। বই বিক্রি ৪ গুণ বেড়েছে আমাদের। বুকস্টলে আসা মানুষের স্রোত দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের ভিড়ের আকার ধারণ করেছিল।' তিনি আরও বলেন, 'যাঁরা গুটখা খেতে খেতে বুকিস্টল বুকিস্টল বলে চিল্লাচ্ছিল, তাঁরা বাদ দিয়ে সমস্ত মানুষই রাস্তায় নেমেছিলেন। যেখানে যেখানে বইয়ের স্টল করতে দেবেনা বলেছে, ভাঙচুর চালিয়েছে, সেখানে সেখানে বই বিক্রি বেড়েছে।'
শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় জানিয়েছিলেন, শারদীয়া বুকস্টল লেখা থাকলে বই বিক্রি করতে দেওয়া হবে না। লিখতে হবে দুর্গাপুজো। এ প্রসঙ্গে সুদীপ বলেন, 'শারদীয়া বা দুর্গাপুজো কোনও আলাদা বিষয় নয় আমাদের কাছে। শুভেন্দুবাবু আসলে নিজেকে RSS প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। পুরনো BJP নেতাদের থেকেও এখন ওঁর বাগাড়ম্বর বেশি। সত্যিকারের RSS রাজনীতি যাঁরা করে তাঁরা এরকম চিল চিৎকার করবে না। বাংলার ঐতিহ্য সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা আছে তাঁদের। ওঁর নিজের সিংহাসন দু'দিন ধরে থাকবে না, তাই অমিত শাহের কাছে পয়েন্ট নেওয়ার জন্য এ সব করছে।'
তাঁর সংযোজন, 'সামনে দাঁড়িয়ে বামপন্থীরা লড়াই রয়েছে। তৃণমূলের অস্তিত্ব ফেসবুকের বাইরে আর নেই। কংগ্রেস নিজের মতো নিজের মতো ব্যস্ত। এই লড়াইয়ে মানুষ রাস্তায় নেমে প্রথম সারিয়ে আমাদের পেয়েছেন, তাই আমাদের আঁকড়ে ধরেছেন। এছাড়াও আমাদের স্টলগুলিতে বাম ঐক্য দেখা গিয়েছে। এই সময়ে একসঙ্গে মিছিল করেছি লিবারেশন, SUCI-এর। ওদের বুকস্টলে আঘাত এলে আমরা রক্ষা করেছি। তেমনই আমাদের স্টলে কিছু হলে ওরা পাশে দাঁড়িয়েছে। এটা তো সম্ভব হয়েছে এ বার।'
কোথায় কত বই বিক্রি?
যাদবপুর বুকস্টল: গত বছর বিক্রি হয় সাড়ে ৪ লক্ষের বই। এ বছর বিক্রি হয় ১৬ লক্ষ ২ হাজার ৪৯৮ টাকার।
বাগবাজার বুকস্টল: আগের বছর বিক্রি হয়েছিল ১ লক্ষ টাকার বই। এ বছর বিক্রি হয়েছে সাড়ে ৪ লক্ষের বই।
বিজয়গড় বুকস্টল: ৬০/৭০ হাজার টাকার বই বিক্রি হয় সাধারণত। এ বছর বিক্রি হয়েছে ১ লক্ষ ৩০ হাজারের বই।
নেতাজি নদর নারকেলবাগানের বুকস্টল: এ বছর বিক্রি হয়েছে ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার বই।