
অন্ধ্র উপকূলের দিকে আরও এগিয়ে আসছে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’। তার প্রভাবে ইতিমধ্যেই উপকূলবর্তী এলাকায় শুরু হয়েছে দুর্যোগ। বিশাখাপত্তনমে ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে উপড়ে পড়েছে গাছ, একটি বিশাল গাছ ভেঙে পড়েছে বাড়ির উপরেও। উত্তাল হয়ে উঠেছে সমুদ্র। অন্যদিকে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়াও বড়সড় পরিবর্তন। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় শুরু হয়েছে বৃষ্টি। পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া দফতর।
বজ্রপাত ও দমকা হাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে কয়েকটি এলাকায়। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার সকালে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে অর্ণব। ফলে আগামী কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলায় কোন কোন জেলায় বৃষ্টির দাপট বাড়বে? উপকূলবর্তী এলাকায় কতটা প্রভাব পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড়ের?
ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের জেরে সমুদ্রও যথেষ্ট উত্তাল। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, বুধবার সকালে বাপটলা ও বিশাখাপত্তনমের মাঝামাঝি, ইয়ানামের কাছ দিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে ঘূর্ণিঝড়টি। উপকূলে আছড়ে পড়ার সময় ঝড়ের সর্বোচ্চ স্থায়ী গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার হতে পারে, দমকা হাওয়ার বেগ পৌঁছতে পারে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারে।
ঝড়ের বিপদ এড়াতে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টি, প্রবল হাওয়া এবং উপকূলবর্তী এলাকায় জল জমার আশঙ্কাও রয়েছে।
ওড়িশাতেও প্রস্তুতি, গঞ্জামে ৯২২টি গ্রাম চিহ্নিত
অর্ণবের প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি শুরু করেছে প্রতিবেশী ওড়িশাও। গঞ্জাম জেলায় ৯২২টি গ্রামকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। পরিস্থিতি খারাপ হলে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ৬,৫০০-র বেশি মানুষকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর।
প্রস্তুত রাখা হয়েছে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র। মোতায়েন করা হয়েছে ওড়িশা ডিজাস্টার র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (ODRAF) এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর (NDRF) বিশেষ দল। ব্রহ্মপুর শহরে জল বের করার নিকাশি নালা পরিষ্কারের কাজও করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে উপকূলবর্তী এলাকায় পর্যটকদের যাতায়াতেও বিধিনিষেধ জারি করেছে প্রশাসন।
ঘূর্ণিঝড়ের জেরে ট্রেন চলাচলেও প্রভাব
অর্ণবের প্রভাবে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ মধ্য রেল (SCR) যাত্রীদের জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে একাধিক ট্রেন বাতিল, ঘুরপথে চালানো অথবা যাত্রার সময় পরিবর্তন করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
রেলের তরফে যাত্রীদের যাত্রা শুরুর আগে ট্রেনের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ২৭ ও ২৮ অক্টোবরের জন্য দক্ষিণ মধ্য রেলের একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। তার মধ্যে সেকেন্দ্রাবাদ-হাওড়া, হায়দরাবাদ-विशাখাপত্তনম এবং সেকেন্দ্রাবাদ-ভুবনেশ্বর রুটের ট্রেনও রয়েছে।
বাংলাতেও অর্ণবের প্রভাব, কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি
অর্ণবের সরাসরি আছড়ে পড়ার আশঙ্কা পশ্চিমবঙ্গে না থাকলেও তার প্রভাবে রাজ্যের আবহাওয়ায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মঙ্গলবার দুপুর থেকেই দক্ষিণবঙ্গের উপকূলবর্তী কয়েকটি এলাকায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাশাপাশি ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, হাওড়া এবং কলকাতার কিছু জায়গায় বৃষ্টি হয়েছে বলে খবর। আগামী দু’দিন কলকাতায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে। পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং পশ্চিম বর্ধমানে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত এবং দমকা হাওয়াও হতে পারে।
২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ
ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ উপকূল এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে সমুদ্র উত্তাল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে। ঝোড়ো হাওয়ার সর্বোচ্চ বেগ ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া দফতর। এই পরিস্থিতিতে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরে স্থানীয় সতর্কতা সংকেত ৩ জারি রয়েছে।
প্রশাসনের তরফে সাধারণ মানুষকেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় থাকা এড়িয়ে চলতে হবে। গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা জলাশয়ের কাছে আশ্রয় নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। নিচু এলাকায় জল জমার পরিস্থিতি তৈরি হলে সতর্ক থাকতে হবে।