
সম্প্রতি কোচবিহারের এক তৃণমূল নেতা রীতিমতো মাইক বাজিয়ে ঘোষণা করেছেন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার (PMAY) জন্য যাঁরা তাঁকে কাটমানি দিয়েছেন, তাঁরা এসে সেই টাকা ফেরত নিয়ে যেতে পারেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এই নেতাকে গ্রামবাসীরা ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। একইভাবে, জলপাইগুড়িতে এক দম্পতি অভিযোগ করেন, PMAY-এর আওতায় একটি বাড়ি পাওয়ার জন্য স্থানীয় এক তৃণমূল নেতা তাঁদের কাছ থেকে কাটমানি নিয়েছিলেন, কিন্তু এখন তিনি তা ফেরত দিতে অস্বীকার করছেন। পুলিশ অভিযুক্তকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করেছে।
আসলে এগুলি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ছাব্বিশের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর বাংলায় প্রতিদিন এমন অনেক ঘটনা সামনে আসছে। বলা হচ্ছে কাটমানি, কমিশন, ঘুষের কারণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল বাংলার জনতা। এমতাবস্থায় বিজেপি তো ছাড়, তৃণমূলের অন্দরের লোকেরাও কাটমানি ইস্যুতে অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্যায়কে নিশানা করতে পিছপা হচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তৃণমূলের রাশ কতটা আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলের মধ্যে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি ও ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে অভিষেকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ চলছে এবং তাঁর সমর্থকেরা রাস্তায় দলীয় কর্মীদের রোষের মুখে পড়ছেন। এতে প্রশ্ন উঠছে: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোথায় ভুল করলেন এবং কেন তিনি অভিষেককে নিজের দুর্বলতায় পরিণত করলেন?
ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস সাক্ষী, যখনই কোনও বিশিষ্ট নেতা তাঁর পরিবার বা কোনও বিশেষ আত্মীয়কে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিয়েছেন, তা প্রায়শই দলের ভেতরে ও বাইরে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ার আগেই যিনি তা সামাল দেন, তাঁকেই বেশি অভিজ্ঞ বলে মনে করা হয়। এই প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর মধ্যে তুলনা করা যেতে পারে। কারণ মায়াবতীও অনেকটা এমনই পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন। দুজনেই রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যাঁরা শূন্য থেকে শুরু করে নিজেদের চেষ্টায় বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। দুজনেই লড়াকু, বাস্তববাদী নেত্রী এবং নিজেদের ভোটব্যাঙ্কের ওপর তাঁদের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে যখন নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীকে সামলানোর প্রশ্ন আসে, তখন চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় মায়াবতীর থেকে অনেক পিছিয়ে আছেন।
উল্কাবেগে অভিষেকের উত্থান!
২০১১ সালে বাংলায় মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্যায়কে তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে প্রবেশ করেন। নিজের তীক্ষ্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে শীঘ্রই রাজনীতিতে উত্থান হয় তাঁর। ২০১৬ সালেই সরাসরি নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহকে নিশানা করে আক্রমণ শানাতে থাকেন অভিষেক। সেই নির্বাচনে বাংলায় দ্বিতীয়বারের জন্য জয় পায় তৃণমূল। অভিযোগ ওঠে তারপর থেকেই দলে ব্যাপক প্রভাব বৃদ্ধি পায় অভিষেকের। প্রবীণ নেতারা ক্রমশই মর্যাদার দিক থেকে কোণঠাসা হতে শুরু করেছেন বলে জল্পনা শোনা যায়। ২০২২ সালে অভিষেককে বলতে শোনা যায়, রাজনীতিবিদদের ৬০ বছর বয়সে অবসর নেওয়া উচিত। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মমতাকে কোণঠাসা করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তৃণমূলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে চেয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্যায়। কিন্তু পুরো বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েও নিশ্চুপ ছিলেন মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্যায় দলের সংগঠন ও নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন। দাবি করা হয়, মূলত অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ই TMC-তে 'কর্পোরেট-শৈলীর রাজনীতি' নিয়ে আসেন। আই-প্যাক-এর মতো কোম্পানির সহায়তায় তিনি পুরনো নেতাদের কোণঠাসা করতে শুরু করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর ফলে বহু প্রবীণ প্রভাবশালী নেতারা দল থেকে নিশ্চুপ ভাবে সরে যান। অবশ্য তার আগে অভিষেকের উত্থানের সময়ই বিরোধের জেরে দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। এখন তাঁর নেতৃত্বেই বাংলায় সরকার গড়েছে বিজেপি।
নির্বাচনে হারের পর দলের এক প্রাক্তন বিধায়ক প্রকাশ্যে বলেন, "অভিষেকের ক্ষমতার দম্ভ এবং স্বজনপ্রীতি পুরো দলটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় সবকিছু জানতেন, কিন্তু ভাইপোর স্নেহে তিনি 'ধৃতরাষ্ট্র'-এর মতো কিছুই করতে পারেননি।"
আর এখানেই মায়াবতীর সঙ্গে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়ের পার্থক্য। মায়াবতী যখন একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তখন তিনি তাঁর ভাইপো আকাশ আনন্দকে বিএসপি থেকে সরিয়ে দেন।
বিজেপি নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকেই অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্যায়কে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে মমতার উপর আক্রমণ শানিয়েছে। কয়লা পাচার, গবাদি পশু পাচার এবং শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারির মতো মামলায় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির (ইডি এবং সিবিআই) তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু সবসময় ছিল অভিষেকই। পুরো নির্বাচনী প্রচার জুড়ে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এই ধারণা তৈরি করতে চেষ্টা করছে যে, মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় নিজে হয়তো সাদামাটা জীবনযাপন করেন, হাওয়াই চপ্পল পরেন, কিন্তু তাঁর ভাইপো দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট চক্র চালায়।
মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায় কোথায় ভুল করলেন? ৩ টি কারণ বুঝে নিন
স্নেহে দিদি দুর্বল: মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় বরাবরই নিজেকে পরিবারহীন এক নিঃস্বার্থ নেত্রী হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু অভিষেকের ক্ষেত্রে তাঁর 'কঠোর রাজনীতিবিদ' ভাবমূর্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
সিন্ডিকেট শাসন: অভিষেককে ঘিরে গড়ে ওঠা নতুন কর্পোরেট চক্র তৃণমূলের প্রকৃত ক্ষোভকে মমতার কাছে পৌঁছাতে বাধা দিয়েছিল। জনগণের ক্ষোভ যখন দানা বাঁধছিল, তখনও দুর্নীতি ও চাকরি কেলেঙ্কারিকে 'বিরোধীদের ষড়যন্ত্র' বলে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
সময়মতো লাগাম টানতে ব্যর্থতা: বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যখন কোনও নতুন নেতা প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল নেতাদের চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করছিল, তখনই শীর্ষ নেতৃত্বের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা উচিত ছিল। অভিষেককে সংযত করার পরিবর্তে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় তাঁকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। যা শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের পতনের একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।