
দুর্গাপুজোয় UNESCO-র নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি মামলায় এ বার প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের মেয়ে আভেরি সেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করল লালবাজার। এই মামলায় ইতিমধ্যেই ইন্দ্রনীলের স্ত্রী মধুছন্দা সেনকে ৩ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। এ বার মেয়ে আভেরিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সামনে বসতে হবে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, 'আই এসকেপ' ও 'মায়রা' নামে দুটি সংস্থার মালিকানা রয়েছে ইন্দ্রনীল সেনের মেয়ের নামে। সেই সংক্রান্ত বিষয়ে আরও বেশি তথ্যসংগ্রহের জন্য প্রাক্তন মন্ত্রীকে মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন।
সরকারি অনুষ্ঠানের টাকা ইন্দ্রনীল সেনের মেয়ের অ্যাকাউন্টেও
সূত্রের খবর, আজ অর্থাত্ সোমবার দুপুর ১২টায় তাঁকে লালবাজারে হাজির হতে বলা হয়েছে আভেরিকে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, সরকারি অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ অর্থও ইন্দ্রনীল-কন্যার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে। সেই লেনদেনের সূত্র খুঁজতেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান গোয়েন্দারা।
গত বুধবার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) তলবে সিজিও কমপ্লেক্সে হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন ইন্দ্রনীল সেন। সেখান থেকে বেরনোর পরই তাঁকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। বর্তমানে ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী থাকাকালীন নিজের পদ ও প্রভাব খাটিয়ে দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শোয়ের ভিআইপি পাস বিক্রির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ তছরুপ করা হয়েছিল।
পাস বিক্রির নামে অন্তত ৩০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম
এই ঘটনায় 'মাস আর্ট' (Mass Art) নামে একটি সংস্থার ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। অভিযোগ, ওই সংস্থাকে সামনে রেখে ইউনেস্কোর নাম, পরিচিতি ও লোগো ব্যবহার করে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শোয়ের ভিআইপি পাস বিক্রি করা হয়েছিল। অথচ ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি সংস্থাটির ছিল না। গত জুন মাসে জয়দীপ মুখোপাধ্যায় নামে এক ট্র্যাভেল এজেন্ট উল্টোডাঙা থানায় এই সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ।
তদন্তকারীদের দাবি, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পুজোর প্রিভিউ শো ও ভিআইপি পাস বিক্রির নামে অন্তত ৩০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। শুধু পুজোর পাস বিক্রিই নয়, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং কলকাতা বইমেলার টেন্ডার নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রাক্তন মন্ত্রী নিজের প্রভাব খাটিয়ে ঘনিষ্ঠদের বেআইনিভাবে কোটি কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। পুজো ও টেন্ডার সংক্রান্ত অনিয়ম মিলিয়ে মোট আর্থিক দুর্নীতির পরিমাণ ১১৫ কোটি টাকারও বেশি বলে দাবি গোয়েন্দাদের।
ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রীকে ৩ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ
এই মামলায় ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রী মধুছন্দা সেনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। আগাম জামিনের আবেদন করে আদালতের রক্ষাকবচ পাওয়ার পর শনিবার বিকেলে লালবাজারে হাজির হন তিনি। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন গোয়েন্দারা। পাস বিক্রির টাকা কোথায় জমা পড়েছে, কীভাবে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে তা স্থানান্তরিত হয়েছে এবং এই আর্থিক লেনদেনে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, তা জানতে একাধিক প্রশ্ন করা হয় তাঁকে।
কলকাতা পুলিশের পাশাপাশি এই মামলার তদন্ত করছে ইডিও। দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির মাধ্যমে কীভাবে টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং সেই অর্থ কোন কোন ব্যক্তি বা সংস্থার অ্যাকাউন্টে গিয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। ইডির একটি প্রেস বিবৃতিতে ইন্দ্রনীল সেনের মালিকানাধীন সংস্থা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে টাকা যাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে ওই লেনদেনের প্রকৃতি ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও স্পষ্ট নয়।