
'লাল পতাকা ছেড়ে যাব না।' মনে আছে ইন্দ্রনীল সেনের সেই ঘোষণা? ২০১২ সালের জানুয়ারিতে গণশক্তি পত্রিকার প্রতিষ্ঠা দিবস। ইন্দ্রনীল সেনে সেই বক্তব্যে অনেক ক্ষণ ধরে হাততালি চলেছিল। তারপর গান ধরলেন, 'ধরো হাল শক্ত হাতে...'। সদ্য পরিবর্তন হওয়া রাজ্যেও বাম আঁকড়ে ধরেছিলেন 'দূরের বলাকা'র গায়ক। প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অত্যন্ত স্নেহের পাত্র ছিলেন।
CPM-এর ব্লু-আইড বয় থেকে মমতার স্নেহধন্য
নব্বইয়ের দশকের মাঝে ইন্দ্রনীল সেনের রিমেক গান 'দূরের বলাকা' অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল। মারকাটারি হিট করেছিল সেই ক্যাসেট। প্রতিটি পুজো প্যান্ডেলে গানের তালিকায় মাস্ট ছিল। ইন্দ্রনীল যে সিপিএম-এর অতি প্রিয়পাত্র ছিলেন, তা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। বললেন, 'উনি সিপিএমের ব্লু-আইড বয় ছিলেন। আমি আর নাম করব না, প্রয়াত একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মেয়ের একটা এনজিও ছিল। সেই এনজিওর সঙ্গেও তিনি (ইন্দ্রনীল) যুক্ত ছিলেন। এঁরা সময়ে সময়ে জলের মত আকার ধারণ করেন। কিন্তু বিজেপি-র তো দরজা বন্ধ। সরকার পরিবর্তনের পরে উনি শুরু করেছিলেন সরকারের ভাল কাজের কথা বলা। কিন্তু এখানে ওসব হবে না।'
২০১৪ সালে হারলেও মমতার গুড বুকেই ছিলেন ইন্দ্রনীল
বাম সরকারের 'ব্লু-আইড বয়' ইন্দ্রনীল অচিরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও ব্লু-আয়েড বয় হয়ে ওঠেন। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বহরমপুর কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করেন। সেখানে কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে লড়াই করে পরাজিত হন তিনি। তবে নির্বাচনে হারলেও মমতার স্নেহভাজনদের তালিকায় প্রথম সারিতেই ছিলেন তিনি। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে চন্দননগর কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করেন মমতা। সেই নির্বাচনে জয়ের পরেই রাজ্য মন্ত্রিসভায় জায়গা পান ইন্দ্রনীল। তাঁর হাতে দেওয়া হয় তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্ব। পরবর্তী সময়ে রাজ্যের পর্যটন দফতরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বামপন্থী বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পরিবারের সঙ্গেও একসময় ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল ইন্দ্রনীলের। প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মেয়ে সুচেতনা ভট্টাচার্যের সঙ্গে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। বুদ্ধদেব অসুস্থ হয়ে পড়ার সময় তাঁর মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল বলেও জানিয়েছিলেন ইন্দ্রনীল। বামপন্থী বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বন্ধুত্বে বাধা থাকা উচিত নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের প্রতি আগ্রহই তাঁকে তৃণমূলের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল বলেও জানিয়েছিলেন ইন্দ্রনীল।
সম্প্রতি আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারির পর তাঁর অতীত রাজনৈতিক যোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শুভেন্দুর দাবি, নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় ইন্দ্রনীল সিপিএমের হয়ে গান গাইতেন ও প্রচার করতেন। তবে ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ এবং তাঁর রাজনৈতিক অতীত। দুটি পৃথক বিষয়। গ্রেফতারির প্রেক্ষিতে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ও দলবদলের ইতিহাস নতুন করে আলোচনায়।