
হাওড়া ব্রিজের ঠিক উল্টোদিকে, এশিয়ার অন্যতম বড় মল্লিকঘাট ফুলবাজারের পাশেই গঙ্গার তীরে আজও নিঃশব্দে বেঁচে রয়েছে কলকাতার এক ঐতিহ্য। শহরের একমাত্র কুস্তির আখড়া, ‘সিয়ারাম আখড়া ব্যায়াম সমিতি’। আধুনিক জিম, ফিটনেস স্টুডিও এবং ডিজিটাল জীবনযাত্রার ভিড়েও এই আখড়া ধরে রেখেছে ভারতীয় মল্লযুদ্ধের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য। প্রতিদিন ভোরে ৪০ জনেরও বেশি কুস্তিগীর এখানে অনুশীলনে যোগ দেন। কারও লক্ষ্য জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য, কারও উদ্দেশ্য সুস্থ শরীর গঠন, আবার অনেকের কাছেই এই আখড়া আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার পাঠশালা।
১৯৬১ সালে শুরু এক ঐতিহ্যের
১৯৬১ সালে কিংবদন্তি কুস্তিগীর নাথমল পারেক, যিনি ‘নাথমল পালোয়ান’ নামে পরিচিত ছিলেন এবং দারা সিংয়েরও প্রশিক্ষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, এই আখড়ার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কুস্তি কেবল শক্তির খেলা নয়; এটি মানুষের চরিত্র গঠন, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা শেখার অন্যতম সেরা মাধ্যম।
এই আখড়ার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে জোয়ালা তিওয়ারির নাম। উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুরের কুস্তিগীর পরিবারে জন্ম তাঁর। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি এই আখড়ায় যোগ দেন। কঠোর অনুশীলন আর অদম্য নিষ্ঠার জোরে একসময় তিনি নাথমল পারেকের উত্তরসূরি হয়ে ওঠেন। পরে সকলের কাছেই তিনি ‘গুরুজি’ নামে পরিচিতি পান।
বাবার স্বপ্ন এখন ছেলের কাঁধে
২০২৩ সালে গুরুজি জ্বালা তিওয়ারির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সুরজ আখড়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই কুস্তির পরিবেশে বড় হওয়া সুরজের প্রথম আখড়ায় আসা মাত্র ছয় বছর বয়সে।
সুরজ বলেন, 'বাবা শুধু আমার বাবা ছিলেন না, তিনি আমাদের সকলের গুরু ছিলেন। হাজার হাজার ছেলেকে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁর ২৫ জনেরও বেশি ছাত্র দেশের হয়ে কুস্তি খেলেছে। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আখড়ায় এসে ছেলেদের শেখাতেন। তাঁর চলে যাওয়ার পর আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। পরে ছেলেরাই আমাকে বলল, এবার আপনাকেই সব সামলাতে হবে।'
বাবার কাছেই প্রশিক্ষণ নিয়ে সুরজ রাজ্যস্তরে ১০টিরও বেশি স্বর্ণপদক জিতেছেন এবং চারবার জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন।
আবার ফিরছে দঙ্গলের ঐতিহ্য
সুরজ জানান, তাঁর বাবা মূলত ঐতিহ্যবাহী 'দঙ্গল'-এ অংশ নিতেন। সেই সময় দঙ্গলের নগদ পুরস্কারের অর্থেই সংসার চলত। তিনি বলেন, 'ধর্মতলার দঙ্গল থেকে পাওয়া টাকাতেই আমাদের সংসার চলত। পরে ধীরে ধীরে দঙ্গলের জনপ্রিয়তা কমে যায়। কিন্তু এখন আবার কুস্তির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে বাঙালি তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সাত-আটজন নতুন বাঙালি ছেলে কুস্তি শিখতে এসেছে। সামনেই সোদপুরে একটি বড় দঙ্গল অনুষ্ঠিত হবে।'
সুরজের কথায়, ভারতীয় মল্লযুদ্ধের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো। রামায়ণ ও মহাভারতেও এই খেলার উল্লেখ রয়েছে। আধুনিক কুস্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছে 'হনুমন্তি', 'জাম্বুবন্তি' এবং 'জরাসন্ধি', এই তিনটি প্রাচীন ধারার ওপর।
তিনি আরও জানান, একসময় বন্দর কর্তৃপক্ষ এই আখড়া সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। তিনি বলেন, 'এক সময় আমাদের আখড়া তুলে দেওয়ার নোটিস এসেছিল। এখন সরকার এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।'
শুধু কুস্তি নয়, মানুষ গড়ার বিদ্যালয়
এই আখড়ায় শুধু শরীরচর্চা শেখানো হয় না, শেখানো হয় জীবনযাপনও। নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, শৃঙ্খলাবোধ এবং নেশামুক্ত জীবন এখানে বাধ্যতামূলক। পালোয়ানদের খাদ্যতালিকায় থাকে দুধ, ঘি, বাদাম, কাজু, কিশমিশসহ পুষ্টিকর খাবার। মাদক বা অন্য কোনও নেশার এখানে কোনও স্থান নেই।
শেখার জন্য লাগে শুধু একটা লঙ্গোট
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এখানে প্রশিক্ষণের জন্য কোনও ফি নেওয়া হয় না। সুরজ বলেন, 'আমার বাবা কখনও কারও কাছ থেকে প্রশিক্ষণের টাকা নেননি। আমরাও নিই না। এখানে জাত-ধর্মের কোনও ভেদাভেদ নেই। যে কেউ আসতে পারে। শুধু একটা লঙ্গোট থাকলেই শেখা শুরু করা যায়। আমাদের একটাই স্বপ্ন, এই আখড়া থেকে আরও অনেক ছেলে-মেয়ে একদিন দেশের হয়ে খেলুক।'
গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট আখড়া তাই আজও শুধু কুস্তিগীর তৈরি করছে না, তৈরি করছে শৃঙ্খলাবদ্ধ, সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ। প্রযুক্তির যুগে যখন অধিকাংশ তরুণ জিম কিংবা ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ব্যস্ত, তখন কলকাতার এই শতাব্দীপ্রাচীন আখড়া নতুন প্রজন্মকে আবারও টেনে আনছে মাটির গন্ধমাখা ভারতীয় মল্লযুদ্ধের ঐতিহ্যের কাছে।