
লোকসভায় বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জন বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন। এই ঘটনায় লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলের নিয়ন্ত্রণ কার্যত হাতছাড়া হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এই বিদ্রোহী ২০ জন তৃণমূল সাংসদের মধ্যে অন্যতম শতাব্দী রায়। দুর্নীতি প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি মুখ খুলেছেন তিনি।
বীরভূমের তৃণমূল সাংসদ স্পষ্ট জানাচ্ছেন, অপরাধবোধ কাজ করলেও এই মুহূর্তে তাঁর কিছু করার নেই। তার জন্য দায়ীও স্বয়ং তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই! বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায় জানিয়েছেন, 'বর্তমান সরকার পূর্বতন সরকারের কর্মকাণ্ডে যেখানে হাত দিচ্ছেন সেখানেই দুর্নীতির যোগ পাচ্ছেন। আমরা দুর্নীতির বিষয়ে যেটুকু জানতাম, সেটুকু জানানো হত। কিন্তু তাতে কোনও স্টেপ নেওয়া হত না কখনও।' সেই অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হত কিনা জানতে চাওয়ায় শতাব্দী রায় জানান, 'না, দিদিকে বলা হলে তিনি সবসময় বলতেন ভুল বোঝাচ্ছে তোমাদের।' অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনযাত্রা নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন সাংসদ শতাব্দী। বলেন,'অভিষেক দলে যেভাবে লিড করে, জীবনযাত্রা যেভাবে তৈরি করেছে, সেটা চোখে লাগার মতো এবং ওর চলাফেরা, ব্যবহার, এসবের জন্য ও সবার কাছে অভিযোগের কারণ। যেখানে দিদি মাটিতে বসে চা খায়, সেখানে অভিষেক মাটিতে বসে না। আর এই ক্ষোভগুলি এখন প্রকাশিত হচ্ছে।'
দল নিয়ে কী বলছেন শতাব্দী?
শতাব্দী রায় বলছেন, 'যদি মাত্র দু'জন সাংসদ দল ছাড়তেন, তবে আমি বলতাম এটা তাঁদের ব্যক্তিগত সমস্যা, কিন্তু যখন কুড়িজন সাংসদ দল ছাড়লেন, তখন বোঝা গেল যে সমস্যা ছিল—এমন সব সমস্যা যার সম্মুখীন হয়েছিলেন বহু সাংসদ—যা দল কখনও স্বীকার বা সমাধান করেনি, তারই ফল এটা। অভিষেক বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি কথা শুনতেন—যদি আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো শোনা হতো...,যখনই আমি নির্দিষ্ট কোনও প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি, তখন প্রায়শই উত্তর এসেছে—‘এখন নয়, এখন নয়’। আর সে কারণেই খুব বেশি কাজ হয়নি..., শেষবার দিদির সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল যেদিন তিনি এসএসসি (SSC) সংক্রান্ত বিষয়ে দিল্লি গিয়েছিলেন, তারপর থেকে আর কোনো কথা হয়নি। এত মানুষ কেন আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দিলেন, সেই বিষয়টি আমাদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উচিত ছিল না অভিষেকের হাতে এত বেশি ক্ষমতা তুলে নাদেওয়া। তাঁর উচিত ছিল নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখে অভিষেককে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা। তাঁরা দুজনে মিলে যদি দল চালাতেন, তবে দল আরও ভালোভাবে কাজ করত, কিন্তু তার বদলে তাঁকে (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়) এত ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া—এবং আই-প্যাক (I-PAC)-কে ক্ষমতাশালী হতে দেওয়া হল, এসব কারণেই পরিস্থিতি বিগড়ে গেছে...।'
মমতাকে নিয়ে শতাব্দী
২০ জন বিদ্রোহী সাংসদদের নিয়ে তাঁরা আলাদা জোন করতে চেয়েছেন, জানালেন শতাব্দী রায়৷ তিনি বলেন, ‘আমরা আলাদা ব্লক চেয়েছি৷ তৃণমূলের আলাদা এই ব্লকটা থাকবে৷ যেখানে এই ২০ জন থাকবে৷ তারা মূল তৃণমূলের সঙ্গে থাকবে না৷’ শতাব্দীর কথায়, ‘আমার একটাই অপরাধবোধ কাজ করছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খারাপ সময়ে তাঁকে ছাড়তে হচ্ছে। কিন্তু দিদিই সেই জায়গায় নিয়ে গেল আমাদের!’ সাংসদ জানান, তিনি এখনও তৃণমূলনেত্রীর সঙ্গে ‘ইমোশনালি অ্যাটাচড’। এই মুহূর্তে তিনি যে নেত্রী মমতার পাশে নেই, তাতে তাঁর কষ্টও হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বললেন, ‘আমার দুঃখটা যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগে কেয়ার করতেন, তা হলে এটা হতো না।’ শতাব্দী বলছেন, 'ইতিহাসে কোনও পার্টির এই হাল হয়নি। হারার জন্য ছাড়িনি, ভুল ডিসিশনের জন্য সবাই সঙ্গ ছাড়ছে।' পাশাপাশি শতাব্দী জানান, দিদির থেকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন পেলে হয়তো তিনি ইমোশনাল ভাবে সঙ্গেই থাকতেন।
তৃণমূল ও কংগ্রেসের জোট
মঙ্গলবার কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার সকালে আবার রাহুল গাঁধীর সঙ্গে দেখা করতে যান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, মমতা-অভিষেক কি তাহলে তাঁদের পক্ষে থাকা তৃণমূলকে নিয়ে কংগ্রেসে যোগ দেবেন? সেই নিয়ে এবার প্রতিক্রিয়া জানালেন শতাব্দী রায়। সাংসদ বলেন, ভবিষ্যত , কংগ্রেস কে ছাড়া তৃণমূলের চলবে না। শতাব্দী বলেন, 'তৃণমূলের কোনও ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছি না। কংগ্রেসের সঙ্গে থাকলে তাও কিছুটা প্রাসঙ্গিক থাকবে। '