
কলকাতা-হাওড়া-সহ পূর্ব ভারতের রেল যোগাযোগ নিয়ে বড় খবর। পশ্চিমবঙ্গের রেল যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার পথে বড় পদক্ষেপ কেন্দ্রের। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত কমিটি রেলের তিনটি মাল্টি-ট্র্যাকিং প্রকল্পে মোট ১০,৭৮৩ কোটি টাকা খরচের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে খড়গপুর-ঝাড়সুগুড়া (বাগদেহি)চার লেনের প্রকল্পও।
আর তা তৈরি হয়ে গেলে হাওড়া- কলকাতা থেকে যাতায়াতকারী ট্রেনগুলিরও সুবিধা হবে। যানজট কমবে। দীর্ঘক্ষণ যাত্রীদের প্রতীক্ষা করতে হবে না।
কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবও জানিয়েছেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেল করিডরগুলির ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কথায়, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেল করিডরগুলির মধ্যে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সাতটি হাই-ডেনসিটি করিডর রয়েছে। এই করিডরগুলিকে চার-লাইনের করার কাজ চলছে। ভবিষ্যতে এই রুটগুলিতে ট্রেনের চাপ আরও বাড়বে বলেই আগে থেকে পরিকাঠামো শক্তিশালী করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য কী প্রকল্প?
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হল খড়গপুর–ঝাড়সুগুড়া (বাগদেহি) চার লেন। খড়গপুর থেকে ঝাড়সুগুড়ার দিকে যাওয়া এই রেলপথ পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি এই করিডর দিয়ে বিপুল পরিমাণ পণ্যবাহী ট্রেনও চলাচল করে। ফলে একটি ট্রেনের জন্য অন্য ট্রেনকে অপেক্ষা করিয়ে রাখার প্রয়োজন কমবে। যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি মালগাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রেও সুবিধা হবে। হাওড়া থেকে যে সব ট্রেন বিভিন্ন রুটে ছাড়ে, সেই সব ট্রেনও পর্যাপ্ত লাইন থাকার কারণে সময়ে যাতায়াত করতে পারবে।
রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, চার লেন তৈরি হয়ে গেলে তার সুফল পাবে কলকাতা ও হাওড়া-কেন্দ্রিক বৃহত্তর রেল নেটওয়ার্ক। কারণ খড়গপুর পূর্ব ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল সংযোগস্থল। ফলে এই করিডরের ক্ষমতা বাড়লে কলকাতা ও হাওড়া থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতকারী ট্রেনের পরিচালনাতেও পরোক্ষ সুবিধা তৈরি হতে পারে। যাত্রীবাহী ট্রেনের জন্যও আরও বেশি সময় ও লাইন ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
রেলমন্ত্রী বললেন, ৭টি হাই-ডেনসিটি করিডরে নজর
রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেলপথগুলির মধ্যে ১১ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সাতটি হাই-ডেনসিটি করিডর রয়েছে। এই করিডরগুলি দেশের মোট রেল ট্রাফিকের প্রায় ৪০ শতাংশ বহন করে।
এই গুরুত্বপূর্ণ করিডরগুলির উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। তাই এগুলির পরিকাঠামো আগে থেকেই বাড়ানোর কাজ চলছে।
তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই সাতটি করিডরের মধ্যে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার ইতিমধ্যেই চার-লাইন করা হয়েছে। আরও প্রায় ৫,০০০ কিলোমিটার রুটে কাজ চলছে অথবা তার অনুমোদন হয়ে গিয়েছে। বাকি প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটারের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। অর্থাৎ, আগামী দিনে দেশের ব্যস্ততম রেলপথগুলিতে আরও বেশি ট্রেন চালানোর মতো পরিকাঠামো তৈরি করাই লক্ষ্য।
দিল্লি-মুম্বই থেকে কলকাতা-চেন্নাই- গুরুত্বপূর্ণ করিডর
রেলমন্ত্রী যে হাই-ডেনসিটি করিডরগুলির কথা বলেছেন, তার মধ্যে দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর যুক্ত রয়েছে। দিল্লি-মুম্বই, মুম্বই-চেন্নাই, চেন্নাই-কলকাতা এবং কলকাতা-মুম্বই-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ রুট দেশের রেল পরিবহণের অন্যতম বড় ভিত্তি। এই করিডরগুলির উপর দেশের মোট রেল ট্রাফিকের প্রায় ৪০ শতাংশ নির্ভর করে বলে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী। ফলে কোথাও একটি লাইনে সমস্যা হলে বা ট্রেনের সংখ্যা বেশি হয়ে গেলে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অতিরিক্ত লাইন তৈরি করে সেই চাপ কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রকল্প কাটনি–পেন্দ্রা রোড
মন্ত্রিসভার অনুমোদিত তিনটি প্রকল্পের মধ্যে দ্বিতীয়টি হল কাটনি–পেন্দ্রা রোড চতুর্থ লাইন। মধ্যপ্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ এই রুটটি ছত্তীসগঢ়ের সঙ্গে রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিল্প ও খনিজ পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের গুরুত্ব রয়েছে।
তৃতীয় প্রকল্প বিলাসপুর–পেন্দ্রা রোড
তৃতীয় প্রকল্পটি হল বিলাসপুর (উসলাপুর)–পেন্দ্রা রোড তৃতীয় লাইন। ছত্তীসগঢ়ের বিলাসপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল ও শিল্পাঞ্চল। এই রুটে তৃতীয় লাইন তৈরি হলে বিদ্যমান রেললাইনের উপর চাপ কমবে এবং ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হবে। ছত্তীসগঢ় থেকে কয়লা, সিমেন্ট, লোহা ও ইস্পাতের মতো বিভিন্ন পণ্য দেশের অন্য প্রান্তে পাঠানো হয়। তাই এই রেলপথের ক্ষমতা বাড়ানো শিল্প ও পণ্য পরিবহণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
১৪ জেলা, ৫ রাজ্যে প্রভাব
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই তিনটি প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তীসগঢ়ের ১৪টি জেলাকে প্রভাবিত করবে। সব মিলিয়ে ভারতীয় রেলের নেটওয়ার্কে প্রায় ৬৫৬ কিলোমিটার নতুন মাল্টি-ট্র্যাকিং সক্ষমতা তৈরি হবে। প্রায় ৪,৭৯০টি গ্রাম এই উন্নত রেল যোগাযোগের সুবিধা পাবে। এই গ্রামগুলিতে মোট আনুমানিক ৫৬ লক্ষ মানুষ বসবাস করেন। কেন্দ্রের দাবি, উন্নত রেল যোগাযোগের ফলে এই এলাকাগুলিতে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্বনির্ভরতার সুযোগও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ১০,৭৮৩ কোটি টাকার এই তিনটি প্রকল্প শুধু নতুন রেললাইন তৈরির কাজ নয়। ব্যস্ত রুটে ট্রেনের চাপ কমানো, যাত্রী পরিষেবা আরও নির্ভরযোগ্য করা, পণ্য পরিবহণের গতি বাড়ানো এবং শিল্প ও পর্যটনের যোগাযোগ উন্নত করাই এর বড় লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে খড়গপুর–ঝাড়সুগুড়া চতুর্থ লাইন প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আর রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের হাই-ডেনসিটি করিডরগুলিকে ধাপে ধাপে চার-লাইনের করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও এই ধরনের মাল্টি-ট্র্যাকিং প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে।