
কলকাতায় বাড়ি কিনতে গেলে এখন শুধু দাম নয়, কতটা জায়গা পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও বড় বিষয় হয়ে উঠছে। বাড়ির দাম বাড়লেও ছোট ফ্ল্যাটে থেমে থাকতে চাইছেন না ক্রেতাদের একটা বড় অংশ। বরং 2 BHK-এর বদলে 3 BHK-এর দিকে ঝুঁকছেন তাঁরা। ANAROCK-এর কনজিউমার সেন্টিমেন্ট সার্ভে– H1 2026-এ কলকাতার ৪৬ শতাংশ উত্তরদাতা 3 BHK পছন্দ করেছেন। শুধু তাই নয়, সারা দেশে ৯০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি টাকার বাড়ির বাজেটই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছেন ক্রেতারা। অর্থাৎ দাম বৃদ্ধির চাপ থাকলেও বড় ও উন্নত মানের বাড়ির জন্য বাড়তি টাকা খরচের মানসিকতা তৈরি হচ্ছে।
কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার ক্রেতারা বাড়ি কিনতে না পারলেও ভাড়া বাড়িতেই থাকছেন। কারণ, তাদের ইচ্ছে, বড় বাড়িতে থাকার। সামর্থ্যে না কুলোলেও তাঁরা ভাড়া অথচ বড় ফ্ল্যাটে থাকাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এখানেই এই সমীক্ষার তিনটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। যথা, কলকাতায় 3 BHK-এর চাহিদা, ৯০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি টাকার বাজেটের জনপ্রিয়তা এবং সম্পত্তির দাম নিয়ে ক্রেতাদের উদ্বেগ। একদিকে ক্রেতারা বড় বাড়ি চাইছেন, অন্যদিকে বাড়ির দাম নিয়ে চিন্তাও রয়েছে। অর্থাৎ কলকাতা-সহ ভারতের হাউজিং মার্কেটে ক্রেতারা বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন না, বরং বাজেট, লোকেশন এবং বাড়ির আকারের মধ্যে নতুন করে সমীকরণ তৈরি করছেন।
3 BHK-তেই বাড়ছে নজর
ANAROCK-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের ৪৮ শতাংশ উত্তরদাতা 3 BHK পছন্দ করেছেন। ফলে এটিই সবচেয়ে বেশি পছন্দের বাড়ির কনফিগারেশন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে 2 BHK। ৩৮ শতাংশ উত্তরদাতা 2 BHK পছন্দ করেছেন।
আরও বড় বাড়ির চাহিদাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। প্রায় ৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাঁরা চার বা তার বেশি বেডরুমের বাড়ি পছন্দ করেন। H1 2024-এ এই হার ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। অর্থাৎ গত কয়েক বছরে বাড়ির ক্ষেত্রে ক্রেতাদের চাহিদা শুধু ‘নিজের একটা ফ্ল্যাট’ থেকে ‘আরও বেশি জায়গার বাড়ি’-র দিকে যাচ্ছে।
কলকাতায় 3 BHK পছন্দ ৪৬ শতাংশের
দেশের একাধিক বড় শহরেই 3 BHK-এর চাহিদা বেশি। আহমেদাবাদে ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা 3 BHK পছন্দ করেছেন। চেন্নাই এবং দিল্লি-NCR-এ এই হার ৫৩ শতাংশ করে। হায়দরাবাদে ৫২ শতাংশ।
কলকাতায় ৪৬ শতাংশ উত্তরদাতা 3 BHK পছন্দ করেছেন। বেঙ্গালুরুর ক্ষেত্রেও হার ৪৬ শতাংশ। পুনেতে ৪৭ শতাংশ। সমীক্ষায় থাকা বাজারগুলির মধ্যে MMR বা মুম্বই মেট্রোপলিটন রিজিয়নে 3 BHK-এর পছন্দ সবচেয়ে কম, ৩৯ শতাংশ।
ANAROCK Group-এর চেয়ারম্যান অনুজ পুরি জানিয়েছেন, 3 BHK-এর প্রতি শক্তিশালী চাহিদার পাশাপাশি বেশি বাজেটের বাড়ি এবং 4 BHK বা তার বেশি বাড়ির প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। তাঁর মতে, বেশি দাম হলেও ক্রেতারা জায়গা ও বাড়ির গুণমানকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
৯০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি, কোন বাজেট সবচেয়ে পছন্দ?
বড় বাড়ির চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে ক্রেতাদের বাজেটও। সমীক্ষায় ৩৪ শতাংশ উত্তরদাতা ৯০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি টাকা দামের বাড়িকে তাঁদের পছন্দের বাজেট হিসেবে জানিয়েছেন। আরও ২৭ শতাংশ উত্তরদাতা ১.৫ কোটি টাকার বেশি দামের বাড়ি পছন্দ করছেন।
অন্যদিকে, ৪৫ লাখ টাকার কম দামের বাড়ির প্রতি আগ্রহ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অর্থাৎ আবাসন বাজারে তুলনামূলক দামি ও উন্নত বাড়ির দিকে ঝোঁক বাড়ছে। এর অর্থ এই নয় যে সব ক্রেতাই উচ্চবিত্ত। বরং নিজের থাকার জন্য বাড়ি কিনতে চাওয়া অনেক ক্রেতাও বাড়তি জায়গা ও উন্নত মানের জন্য বেশি খরচ করতে রাজি হচ্ছেন।
বাড়ির দাম নিয়ে চিন্তাও কম নয়
তবে ছবির অন্য দিকও রয়েছে। বাড়ির দাম বাড়ায় ক্রেতাদের একটা বড় অংশ চিন্তিত। সমীক্ষায় প্রায় ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, বর্তমান সম্পত্তির দাম বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে তাঁরা অন্তত মাঝারি মাত্রায় উদ্বিগ্ন। ৪০ শতাংশের মতে, এই দাম বৃদ্ধির প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। কিন্তু এই উদ্বেগের অর্থ এই নয় যে মানুষ বাড়ি কেনার পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল করছেন।
প্রায় ৪৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাঁরা বাড়ি কেনার পরিকল্পনা চালিয়ে যাবেন। ৩৮ শতাংশ সামান্য দেরি করতে পারেন। মাত্র ১৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কেনা পিছিয়ে দিতে পারেন অথবা পরিকল্পনা বাতিল করতে পারেন।
যাঁরা বাড়ি কেনা পিছিয়ে দিচ্ছেন বা বাতিল করছেন, তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা সামর্থ্য বা সাধ্যের অতীত। ৪৪ শতাংশ এই কারণের কথা বলেছেন। আরও ৩২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের বাজেটের মধ্যে পছন্দমতো বাড়ির বিকল্প কম।
বাড়ি নয়, আপাতত ভাড়া?
বাড়ির দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতারা বিকল্প পথও খুঁজছেন। প্রায় ৩১ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা বাড়ি কেনার বদলে ভাড়া নেওয়ার কথা ভাবছেন। ২০ শতাংশ ক্রেতা শহরের মূল এলাকার বদলে অপেক্ষাকৃত দূরের দিকে নজর দিচ্ছেন। অর্থাৎ বাড়ি কেনার ইচ্ছা থাকলেও ক্রেতারা লোকেশন, বাজেট এবং সময়- তিনটি বিষয় নিয়েই নতুন করে হিসাব করছেন।
নিজের থাকার জন্যই বাড়ি কিনছেন বেশিরভাগ
সমীক্ষার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, এই চাহিদার বড় অংশই নিজের থাকার জন্য। ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাঁরা নিজের ব্যবহারের জন্য বাড়ি কিনছেন। বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বাড়ি কিনছেন ৩২ শতাংশ।
তবে বাড়ি কেনার সময় বিনিয়োগের দিকটিও মাথায় রাখছেন ক্রেতারা। অন্তত ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, কোনও সম্পত্তির বিনিয়োগ সম্ভাবনা বিচার করার সময় ভাড়া থেকে আয়কে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ৬৭ শতাংশ গুরুত্ব দেন ভবিষ্যতে সম্পত্তি বিক্রি করলে কতটা দাম পাওয়া যেতে পারে, সেই সম্ভাবনাকে।
বিনিয়োগে এখনও এগিয়ে রিয়েল এস্টেট
বাড়ির দাম নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রিয়েল এস্টেটের জনপ্রিয়তা রয়েছে। সমীক্ষায় ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, বিনিয়োগের জন্য তাঁদের পছন্দের সম্পদ রিয়েল এস্টেট। এরপর রয়েছে শেয়ার বাজার, ২০ শতাংশ। সোনা ১১ শতাংশ এবং ফিক্সড ডিপোজিট ৯ শতাংশ।
সব মিলিয়ে সমীক্ষার ছবি বলছে, ভারতের আবাসন বাজারে ক্রেতারা চাপের মধ্যে থাকলেও বাড়ি কেনার ইচ্ছা হারাচ্ছেন না। বরং ছোট বাড়ির বদলে বড় বাড়ি, কম বাজেটের বদলে ৯০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি টাকার সেগমেন্ট এবং শহরের কেন্দ্রের বদলে প্রয়োজনে দূরের লোকেশন- এই তিনভাবে তাঁরা নিজেদের হিসাব বদলাচ্ছেন।
কলকাতার ক্ষেত্রেও 3 BHK-এর প্রতি ৪৬ শতাংশ ক্রেতার আগ্রহ সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাড়ির দাম নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, কিন্তু তার মধ্যেও নিজের পছন্দের বাড়ির জন্য বেশি খরচ করার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ বাড়ি কেনার বাজারে চাপ বাড়লেও বড় ও ভালো বাড়ির স্বপ্ন এখনও থামেনি।