
রবিবার সন্ধ্যা থেকে দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (SRFTI)। ৭-৮ ঘণ্টা ধরে কার্যত তাণ্ডব চলে ক্যাম্পাসে। গোটা ঘটনা নিয়ে পঞ্চসায়র থানায় ৩টি পৃথক FIR দায়ের হয়েছে। একটি করেছে অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত সমিতি, একটি SRFTI পড়ুয়াদের একাংশ এবং তৃতীয় পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে করেছে। যদিও ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
সংঘর্ষ নিয়ে কী বক্তব্য রুদ্রনীল ঘোষের?
বিধায়কের কথায়, 'সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউড কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আজকে যে ঘটনা ঘটেছে, যারা ঘটিয়েছে তারা যে সনাতনী মানুষদের পরিপন্থী তা প্রমাণ করলেন। বিবেকানন্দ তাদের পছন্দ নয়। অতিবাম মানসিকতার লোকজন গুলি-বন্দুক নিয়ে মানুষ মেরে সংসদ দখল করার কথা বলেন, যারা দেশকে টুকরো করে বিচ্ছিন্নতাবাদের কথা স্পষ্ট করে বলেন, তাদের এই অরাজগতার উত্তর মানুষ দেবে। এইরকম একটা সরকারি জায়গার ভিতরে তাণ্ডব সভ্যতা নয়, তা আর বলার অবকাশ থাকে না। প্রশাসন কড়া বন্দোবস্ত নেবে। এরা প্রত্যেকবার প্রমাণ করে দিচ্ছে, যে কোনও মূল্যে দেশকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়।' রুদ্রনীলের মতে, সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক একটি বিষয় চলছিল। সেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে যে পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে এবং সেটি অপরাধমূলক। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
পাল্টা কী বলছেন বাম নেতারা?
SFI-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য বলেন, 'SRFTI-তে যা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক সভ্য দেশে এটা হতে পারে না।' বাম নেত্রী দীপ্সিতা ধর বলেন, 'সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে BJP-র তাণ্ডব। আক্রান্ত ছাত্র-ছাত্রীরা। বাংলার সমস্ত কিছু যা গর্বের, তাতেই এই শকুনদের নজর। কি আপদকে নিয়ে আসলেন মশাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই গরুদের সার্বিক বয়কট প্রয়োজন।'
CPIM নেতা বিকাশ ভট্টাচার্যের কথায়, 'দেবী, কাপুরুষ-মহাপুরুষ, গণশত্রু সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় সরাসরি RSS মতাদর্শকে আক্রমণ করেছেন। আজ তাঁর স্মৃতিতে তৈরি গবেষণা কেন্দ্র আক্রান্ত RSS প্রাণিত গো সন্তানদের হাত। গোটা দেশ জুড়ে মুক্ত চিন্তার শিক্ষাঙ্গন ধ্বংস করার কাজে লিপ্ত RSS। একটি উৎকর্ষ বিদ্যালয় গড়ার ক্ষমতা নেই, আছে ধ্বংসের ইতিহাস। এখন আর দেরি নয়, সময় এসেছে রুখে দাঁড়ানোর।'
ঠিক কী ঘটেছিল ক্যাম্পাসে?
রবিবার দুপুরে SRFTI-এর ভিতরে মূল প্রেক্ষাগৃহে RSS ঘনিষ্ঠ সংগঠন অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত (ABGP) একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেখানেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি চরম আকার ধারণ করে। অভিযোগ, ছুরি, রড হাতে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে হামলা চালায়। ঘিরে ফেলা হয় শিক্ষাঙ্গন।
ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ, ইটের আঘাতে একটি শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। মেয়েদেরও মারধর করা হয়। স্থায়ীয় BJP কর্মীরাও ক্যাম্পাসের বাইরের চত্বর ঘিরে ফেলে। শিক্ষকরা অধিকাংশই ছাত্র-ছাত্রীদের বিপন্নতা বুঝতে পেরে ক্যাম্পাসে চলে আসেন।
পাল্টা ABGP-র দাবি, তাদেরও ৫ জন আহত। পড়ুয়ারা বিবেকানন্দ ও ভারতমাতার পোস্টার ছিড়ে ফেলায় এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ সঙ্ঘ ঘনিষ্ট এই সংগঠনের। তাদের সভা ভেস্তে দেওয়া হয় বলেও দাবি।
এদিকে, অভিযোগ ওঠে, ছাত্রছাত্রীদের মারধরে অভিযুক্ত ABGP-র কয়েকজন প্রতিবাদের মুখে একটি বাসে উঠে পড়ে। সেই বাসে মহিলারাও ছিলেন। ছাত্র-ছাত্রীদের একাংশ সেই বাস ঘিরে প্রতিবাদ করে, ই
ছোড়ে বলে অভিযোগ। এমনকী আহতদের নিয়ে ABGP-র সদস্যরা হাসপাতালে যেতে চাইলে তাদের বাধা দেওয়া হয়।
কোন থানা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে, তা নির্ণয় করতে অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়। ততক্ষণে ক্যাম্পাস রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল।
SRFTI কর্তৃপক্ষের কী বক্তব্য?
নবনিযুক্ত উপাচার্য সন্তোষ আজমেরা রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ ক্যাম্পাসে পৌঁছন। তিনি বলেন,'এমন ঘটনা যে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই অনভিপ্রেত। SRFTI দেশের প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ছাত্র-ছাত্রীরা আমায় বলেছেন তাঁরা হিংসায় ইন্ধন জোগায়নি। আমি শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে চলছি।' কেন্দ্রীয় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, সাংসদ সুরেশ গোপীও গোটা ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
SRFTI-এর এই ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়াতেও প্রভাব ফেলেছে। সারা দেশের বিদ্বজন এবং বিনোদন জগতের বিশিষ্টদের থেকে কড়া প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়।