
একসময় কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানগুলোর তাকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা বই পড়ে থাকত অবহেলায়। মাসের পর মাস, কখনও বা বছরের পর বছর ধুলো জমত সেই বইয়ের মলাটে। কিন্তু সময় বদলেছে। বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের পর ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখতে শুরু করেছেন বহু পাঠক। আর তারই জেরে হঠাৎ করেই বেড়ে গিয়েছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা বইয়ের চাহিদা।
কলেজ স্ট্রিটের একাধিক বই বিক্রেতার দাবি, পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে মানুষের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। তাঁর জীবন, চিন্তাধারা, রাজনৈতিক ভূমিকা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান নিয়ে লেখা বই এখন নিয়মিত খুঁজছেন পাঠকরা।
কলেজ স্ট্রিটের একাধিক বই ব্যবসায়ী জানান, কয়েক বছর আগেও এই ধরনের বই বিক্রি হতো হাতে গোনা। বছরে একটি বা দুটি কপি বিক্রি হওয়াই ছিল বড় ঘটনা। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিদিনই বহু মানুষ বিশেষভাবে শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে লেখা বইয়ের খোঁজ করছেন। তাঁর কথায়, আগে যে বইগুলো তাকেই পড়ে থাকত, এখন সেগুলো নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন অন্য প্রকাশক ও বই বিক্রেতারাও। তাঁদের মতে, চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে বইয়ের অর্ডার দিতে হচ্ছে। শুধু সাধারণ পাঠকই নন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এখন শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে লেখা বই সংগ্রহ করছে। অনেক স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের পুরস্কার হিসেবেও এই ধরনের বই দেওয়া হচ্ছে।
পাঠকদের একাংশের মতে, বাংলার ইতিহাস ও রাজনীতিকে বুঝতে গেলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নতুন করে জানা জরুরি। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক হিসেবে অবদান নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলায় সমাবর্তন ভাষণ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষক মহলের অনেকেরই মত, দীর্ঘদিন ধরে শ্যামাপ্রসাদের জীবন ও কাজ নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাঁর সম্পর্কে খুব কম জানেন। সেই শূন্যতা পূরণ করতেই এখন বইয়ের দিকে ঝুঁকছেন পাঠকরা।
কলেজ স্ট্রিটের কয়েকজন বিক্রেতা জানিয়েছেন, শুধু জনপ্রিয় জীবনী নয়, বহু পুরনো ও বর্তমানে অপ্রাপ্য বই নিয়েও খোঁজখবর বাড়ছে। বিশেষ করে ‘শ্যামাপ্রসাদের নির্বাচিত রচনা’র মতো বই পুনর্মুদ্রণের দাবি উঠছে পাঠকদের তরফে।
এক অধ্যাপক জানান, রাজ্যের বিভিন্ন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা বলা হচ্ছে। ফলে তাঁর জীবন ও কাজ সম্পর্কে গভীরভাবে জানার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। সেই কারণেই তিনি নিজেও তাঁর ওপর লেখা বই সংগ্রহ করেছেন।
বই বিক্রেতাদের মতে, তথাগত রায়ের ‘ভারত কেশরী যুগপুরুষ শ্যামাপ্রসাদ’ এবং উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরি ও মৃত্যু প্রসঙ্গ’ বই দুটির বিক্রি গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, রাজ্য সরকার সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন ৬ জুলাই রাজ্যজুড়ে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালন করা হবে। সেই ঘোষণার পর থেকেই তাঁর জীবন ও উত্তরাধিকার সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন কলেজ স্ট্রিটের বই ব্যবসায়ীরা।
একসময় ধুলোমাখা তাকের কোণে পড়ে থাকা বইগুলোই এখন হয়ে উঠেছে পাঠকদের অন্যতম চাহিদার কেন্দ্র। ইতিহাসকে নতুন করে জানার এই আগ্রহই যেন কলেজ স্ট্রিটের পুরনো বইগুলিকে আবার নতুন জীবন দিয়েছে।