
তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদাম ধসের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এখনও পর্যন্ত গুদামের ভিতরে ঠিক কতজন শ্রমিক কাজ করছিলেন, তার নির্ভরযোগ্য কোনও হিসাব পুলিশের হাতে নেই। অভিযোগ, শ্রমিকদের উপস্থিতি নথিভুক্ত করার জন্য সেখানে কোনও রেজিস্টারই রাখা হত না। ফলে ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও কতজন আটকে থাকতে পারেন, তা নিয়েও ধোঁয়াশা কাটেনি। উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার পর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করে পুলিশ। এফআইআরে মোট পাঁচজনের নাম ছিল। তাঁদের মধ্যে প্রধান ঠিকাদার আসগর হুসেনের দেহ বৃহস্পতিবার সকালে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি চার অভিযুক্তকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন অয়ন ট্রেডার্সের বিল্ডিং সুপারভাইজার মহম্মদ গুলজার, যাঁদের সংস্থা গুদামের ছাদ নির্মাণের কাজে যুক্ত ছিল। এছাড়া গ্রেফতার হয়েছেন বন্দর কর্তৃপক্ষের জমি লিজ নিয়ে গুদাম নির্মাণকারী সংস্থা বেহরা ব্রাদার্সের মালিক শম্ভুনাথ বেহরা, লোহার কাঠামো প্রস্তুতকারক কমল সামন্ত, শ্রমিক সরবরাহকারী দিবাকর ভাণ্ডারী এবং কলকাতা পুরসভার নকশা অনুমোদনের মধ্যস্থতাকারী আব্দুল হামিদ।
বৃহস্পতিবার লালবাজারে সাংবাদিক বৈঠক করে কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) কুণাল অগ্রবাল জানান, এখনও পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। আহত ১৯ জন এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। উদ্ধার অভিযান এখনও শেষ হয়নি। তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, শম্ভুনাথ বেহরার স্ত্রীও সংশ্লিষ্ট সংস্থার অন্যতম অংশীদার।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত গুলজারের বিরুদ্ধে অতীতেও অপরাধমূলক অভিযোগ রয়েছে। একবালপুরের একটি মারপিটের ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়েছিল। অন্যদিকে, মৃত ঠিকাদার আসগরের বিরুদ্ধেও আগে দুটি মামলা ছিল, একটি ২০১৩ সালের বন্দর দক্ষিণ থানার মামলা এবং অন্যটি একবালপুর থানায় দায়ের হওয়া অপহরণের মামলা।
তদন্তে গতি আনতে একাধিক দল গঠন করেছে লালবাজার। কারা কারা এই ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বা অভিযুক্ত হতে পারেন, তার একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের সঙ্গেও কথা বলার পরিকল্পনা রয়েছে তদন্তকারীদের। তাঁদের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও অন্যান্য তথ্যও খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে কলকাতা পুরসভার কাছ থেকে একাধিক নথি ও তথ্য চেয়েছে পুলিশ। পুরসভার কোনও আধিকারিকের গাফিলতি বা ভূমিকা ছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই দুর্ঘটনার জন্য পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে দায়ী করেন। তাঁর দাবি, ভেঙে পড়া গুদামের নকশায় প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমেরও স্বাক্ষর রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই ঘটনায় কাউকেই রেয়াত করা হবে না। সেই বার্তার পর তদন্ত আরও জোরদার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি, কলকাতা ও শহরতলিতে আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত সমস্ত নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশও দিয়েছে রাজ্য সরকার।