
জইশ-ই-মহম্মদ-এর সন্দেহভাজন জঙ্গি হামিম মণ্ডল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাসভবন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে রেকি চালিয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পাকিস্তান-ভিত্তিক হ্যান্ডলারদের নির্দেশে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এই কাজ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে স্পেশাল টাস্ক ফোর্স।
এসটিএফ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত সপ্তাহে পূর্ব বর্ধমান থেকে গ্রেফতার হওয়া হামিম মণ্ডল এবং তার দুই সহযোগী অর্পিতা সরকার ও আদিত্য সিনহার জিজ্ঞাসাবাদে এই তথ্য সামনে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি, অর্পিতাকে হানিট্র্যাপের অপারেটিভ হিসেবে ব্যবহার করার ছক কষেছিল হামিম।
তদন্তকারীদের দাবি, হামিম মণ্ডলের দায়িত্ব ছিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর গতিবিধির উপর নজর রাখা, তিনি যেসব জনসভা ও সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন সেখানে উপস্থিত থেকে নিরাপত্তার দুর্বল দিকগুলি চিহ্নিত করা।
এসটিএফের দাবি, হামিম শুভেন্দু অধিকারীর একাধিক অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। কলকাতার চিড়িয়ামোড়-সংলগ্ন চিনার পার্ক এলাকায় মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের আশপাশেও রেইকি চালায় সে।
এক শীর্ষ এসটিএফ আধিকারিক জানিয়েছেন, প্রথমে জেরার সময় হামিম ওই এলাকায় যাওয়ার কথা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু মোবাইল টাওয়ারের লোকেশন-সহ প্রযুক্তিগত প্রমাণে তার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর সে রেইকি চালানোর কথা স্বীকার করে। ফলে তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, হামিম ও তার সহযোগীরা রাজ্য সচিবালয় নবান্ন এলাকাতেও নজরদারি চালিয়েছিল কি না। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনও ফাঁকফোকর খুঁজতেই তারা সেখানে গিয়েছিল বলে সন্দেহ।
এসটিএফ জানিয়েছে, নবান্ন সংলগ্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলের প্রযুক্তিগত তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের এই পর্যায়ে কোনও সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, শুভেন্দু অধিকারীর বাসভবনের কাছাকাছি দীর্ঘ সময় নজরদারি চালানোর উদ্দেশ্যে হামিম ভাড়া বাড়ি নেওয়ার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখেছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত সে কোনও বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এসটিএফের অভিযোগ, হামিম মণ্ডলের সরাসরি যোগাযোগ ছিল পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ISI এবং পাকিস্তান-ভিত্তিক গ্যাংস্টার শাহজাদ ভাট্টি পরিচালিত একটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে।
তদন্তকারীদের দাবি, ডিজিটাল তথ্য, আর্থিক লেনদেন এবং যোগাযোগের নথি খতিয়ে দেখে এই আন্তঃসীমান্ত ষড়যন্ত্রের পূর্ণ চিত্র সামনে আনার চেষ্টা চলছে। তদন্ত এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।
STF আরও অভিযোগ করেছে, ধৃত অর্পিতা সরকারকে 'হানিট্র্যাপ' অপারেটিভ হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল। তার কাজ ছিল প্রভাবশালী রাজনীতিক, শীর্ষ আমলা এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে গোপন তথ্য সংগ্রহ করা।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, এই গোটা মডিউলের উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা। সেই পরিকল্পনায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। এই তথ্য সামনে আসার পর মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে বলে নবান্নের এক শীর্ষ আমলা জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে STF খতিয়ে দেখছে, শাহজাদ ভাট্টির নেটওয়ার্ক বা পাকিস্তান-সমর্থিত অন্য কোনও জঙ্গি বা অপরাধচক্র এখনও পশ্চিমবঙ্গে সক্রিয় রয়েছে কি না। এছাড়া এই ষড়যন্ত্রে কোনও স্লিপার সেল বা স্থানীয় সহযোগী লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছিল কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। STF-র এক আধিকারিকের কথায়, 'এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনও স্লিপার সেল বা স্থানীয় সহযোগী এই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল কি না, সেটাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।'