
পশ্চিমবঙ্গে সদ্য অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে ৮০টি আসনে জিতেছে তৃণমূল। পরিসংখ্যান বলছে, তার মধ্যে ৭৩টি আসনেই সংখ্যালঘু ভোটারের হার ২৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ, সেখানে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়ে থাকেন সংখ্যালঘুরা। সে কারণে রাজ্যে মোট যত আসনে তৃণমূল জয়ী হয়েছে, তার ৯১ শতাংশই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। সত্যি কথা বলতে নিজেদের জয়ে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের উপর ভরসা করেছে তৃণমূল। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভরসার সেই সংখ্যালঘু বিধায়করা যোগ দিচ্ছেন বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীতে। যদিও, বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর চিঠিতে দলনেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু, তৃণমূল শিবিরের কপালে চিন্তার ভাঁজ চওড়া করার জন্য এই ঘটনা যথেষ্ট।
সূত্রের খবর, বিক্ষুব্ধ এই শিবিরের যে তালিকাটি এখনও পর্যন্ত সামনে এসেছে, তাতে সংখ্যালঘু বিধায়কদের সংখ্যা রীতিমতো নজরকাড়া। এই তালিকায় যেমন রয়েছেন তৃণমূলের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও প্রবীণ নেতা জাভেদ খান, তেমনই রয়েছেন কাজল শেখের মতো দাপুটে নেতৃত্বও। ঘটনাচক্রে, জাভেদ খানকে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী বিধানসভার উপ বিরোধী নেতা হিসেবে মনোনিত করেছেন। অন্যদিকে, মুখ্যসচেতক হিসেবে রয়েছে আখরুজ্জামানের নাম। পূর্বতন মন্ত্রিসভার চার জন সংখ্যালঘু মন্ত্রী বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের এই গোষ্ঠীতে রয়েছেন। এরা হলেন জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, গোলাম রব্বানী এবং আখেরুজ্জামান।
এখনও পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ তৃণমূল শিবিরের যে সমস্ত সংখ্যালঘু বিধায়কদের নাম সামনে আসছে, তাঁরা হলেন, জাভেদ খান (ডেপুটি লিডার হিসেবে মনোনীত), আখরুজ্জামান (মুখ্যসচেতক), কাজল শেখ, গোলাম রব্বানী, ড. মোশাররফ হোসেন, ইমানি বিশ্বাস, নিয়ামত শেখ, রেয়াত হোসেন, গুলশন মল্লিক, তৌসিফুর রহমান, মুস্তাফিজুর রহমান এবং বাহারুল ইসলাম। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল মুর্শিদাবাদের ৯জন সংখ্যালঘু বিধায়কের মধ্যে ৮ জনই যোগ দিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে।
প্রসঙ্গত, বুধবার, তৃণমূল চিহ্নে জিতে আসা ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিধায়ক ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসাবে বেছে নিয়েছেন। এই আবহে মুর্শিদাবাদ জেলা তৃণমূলের অন্দরেও বিভাজন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মমতাকে দলনেত্রী মানলেও অভিষেকে নারাজ তাঁরা। মুর্শিদাবাদে ৯ জন সংখ্যালঘু বিধায়কদের মধ্যে ৮ জনই ‘বিদ্রোহী’ হয়েছেন। সেই তালিকায় রয়েছেন বহু চর্চিত সাগরদিঘির বিধায়ক বায়রন বিশ্বাসও। তিনি নিজে জানিয়েছেন, বুধে তিনিও ছিলেন বিধানসভায়। সেইসঙ্গে জানান, 'আমিও সই করেছি।' অর্থাৎ ঋতব্রত টিম-এর ৫৮ জনের মধ্যে, একজন সাগরদিঘির বিধায়ক। ৫০ সাক্ষরের মধ্যে একটি তাঁর।
এই ‘বিদ্রোহে’র অন্যতম কারিগর মনে করা হচ্ছে রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামানকে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যখন মুর্শিদাবাদ জেলার তৃণমূল কংগ্রেসের পর্যবেক্ষক ছিলেন তখন ২০১৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে আখরুজ্জামান তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করেছিলেন। এবার তিনি ঋতব্রতের পাশে এসে জেলার সামশেরগঞ্জের বিধায়ক নুর আলম, সুতির ইমানি বিশ্বাস, লালগেলার আব্দুল আজিজ, ভগবানগোলার রিয়াত হোসেন সরকার ও হরিহরপাড়ার নিয়ামত শেখ ও ভরতপুরের বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান ও সাগরদিঘির বায়রন বিশ্বাসকে একএিও করতে সক্ষম হয়েছেন। আখরুজ্জামান বলছেন, 'মুর্শিদাবাদ জেলার ৯ জন বিধায়কের মধ্যে ৮ জন আমাদের সমর্থন করেছেন। আমরা দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি।' একমাত্র জলঙ্গির নবনির্বাচিত বিধায়ক তথা শিক্ষাবিদ বাবর আলি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আস্থা রেখেছেন।
খালি ঋতব্রতর শিবিরে নাম লেখানোই নয় মমতার সংশ্রবও এড়াচ্ছেন মুর্শিদাবাদের তৃণমূল বিধায়করা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ জেলার ২২টি আসনের মধ্যে কুড়িটি আসনে জয়লাভ করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল কংগ্রেসের সেই 'সুদিনের' সময়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় কোনও বৈঠকের ডাক দিলে মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে ডাক পাওয়া সমস্ত বিধায়করা প্রায় একদিন আগে থেকেই কলকাতায় হোটেল ভাড়া করে থাকতে চলে আসতেন, যাতে দলের নেত্রীর বৈঠকে সঠিক সময়ে পৌঁছতে পারেন এবং পিছনের সারিতে বসতে না হয়। কিন্তু ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর সেই ছবি বদলে গিয়েছে। জেলায় এই মুহূর্তে তৃণমূলের একাধিক বিধায়ক থাকলেও দল আর রাজ্যে ক্ষমতায় না থাকায় দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি বিধায়করা। গত রবিবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের বৈঠকে তাই দেখা যায়নি তাঁদের। দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ২০ জন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। 'কোরাম' না হওয়ায় সেই বৈঠক বাতিল করে দিতে বাধ্য হন তৃণমূল নেত্রী। সূত্রের খবর, রবিবার কলকাতার কালীঘাটের বৈঠকে মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে নির্বাচিত তৃণমূল কংগ্রেসের একজন বিধায়কও উপস্থিত ছিলেন না।
পরিসংখ্যান বলছে, তৃণমূলের টিকিটে জেতা ৩৪ জন মুসলিম বিধায়কের মধ্যে ১৭ জনই বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখালেন। ২০১১ সাল থেকে তৃণমূলকে ঢালাও ভোট দিয়েছেন মুসলিমরা। মুসলিমদের স্থায়ী ভোটব্য়াঙ্ক ধরে নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এবারের ভোটে বদলে গিয়েছে গোটা চিত্র। মুসলিমদের একটা বড় অংশ এবার সিপিএম-কংগ্রেস, কিংবা আইএসএফকে ভোট দিয়েছে। এর পর ফলতার পুনর্নির্বাচনও দেখিয়ে দিয়েছে, মুসলিম ভোটাররা আর তৃণমূলের পক্ষে নেই। প্রায় ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট থাকা ফলতায় জামানত জব্দ হয়েছে তৃণমূলের। আর এবার দেখা গেল তৃণমূলের মুসলিম বিধায়কদের বড় অংশ বিরোধী দলনেতা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পছন্দকে মানলেন না।