
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গৃহযুদ্ধ চরমে। ফল ঘোষণার পর থেকেই তৃণমূলে ভাঙন চলছে। দলে বেসুরো বিধায়কের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এমনকি খোদ দলনেত্রী লাইভে এসে দাবি করছেন , তৃণমূল কংগ্রেস ভাঙার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। আর এসবের মাঝেই, বাংলার রাজনীতিতে এবার মহারাষ্ট্রের ছায়া পড়তে পারে বলেও জল্পনা বাড়ছে। শিবসেনা বা এনসিপি-র মতো তৃণমূলেও দল ভাঙনের ছায়া ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে ।
তৃণমূল ভাঙছে?
তৃণমল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার অভিযোগ করেছেন, মহারাষ্ট্রে বিজেপি যেভাবে দল ভাঙিয়েছে, সেই চেষ্টা হবে বাংলাতেও। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে বাংলার তৃণমূলের উপর মহারাষ্ট্রের এনসিপি-শিবসেনার ছায়া দেখছেন অনেকেই। কিন্তু এখানে হাত বিজেপির নয়, বরং কিছুটা উলটো। এখন বহিরাগত শক্তির চেয়ে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই তৃণমূলের কাছে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এক্ষেত্রে উঠে আসছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম।
গোপন বৈঠক বিধায়কদের
উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহাকে সোমবার দলবিরোধী কাজের অভিযোগে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল। দুই বিধায়কের অভিযোগ ছিল, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের জন্য জমা দেওয়া নথিতে কয়েকজন বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। তাঁরা বিষয়টি লিখিতভাবে বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুকে জানান। এরপর ওই ঘটনার তদন্ত শুরু হয়। সূত্রের খবর, এসব আলোচনার মাঝেই নাকি সোমবার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের নিয়ে দফায় দফায় শহরের হোটেলে বৈঠকে বসেছিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্য শিবিরে যে বৈঠক করছে সেকথা সংবাদমাধ্যমের সামনে স্বীকারও করে নিয়েছেন বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। দাবি করা হচ্ছে, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী তৃণমূলের ৫০ বিধায়ক। সূত্রের খবর, স্পিকারের কাছে জমা পড়তে চলেছে এই ৫০ বিধায়কের তালিকা। নিজেদের ‘প্রকৃত তৃণমূল’ বলে দাবি করেছেন তাঁরা। সূত্র আরও বলেছে, এই ব্লকের মুখ হতে পারে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও এই তালিকায় কুণাল ঘোষ, ফিরহাদ হাকিম বা মদন মিত্রের মতো নেতাদের নাম নেই।
মদন ও কুণালের ব্যাখ্যা
সূত্রের দাবি, শীর্ষ নেতৃত্বকে অন্ধকারে রেখেই পৃথক পৃথক ভাবে বৈঠক করছে অন্য গোষ্ঠী। এই বৈঠক করার জন্য দুই বহিষ্কৃত বিধায়কের দিকে আঙুল তুলেছেন মদন মিত্র। যদিও বৈঠকের বিষয়টা অস্বীকার করেছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। সূত্রের খবর, তৃণমূল এখন কার্যত আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে এক গোষ্ঠী হোটেলে নিজেদের মধ্যে বৈঠকও সেরে ফেলেছে এবং দ্বিতীয় বৈঠকটি হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার এক তৃণমূল বিধায়কের বাড়িতে। সূত্রের দাবি, শীর্ষ নেতৃত্বকে পুরোপুরি অন্ধকারে রেখে, সোমবার কলকাতার হোটেলে হওয়া বৈঠকে কয়েকজন তৃণমূল বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন। আর রবিবার উত্তর ২৪ পরগনার তৃণমূল বিধায়কের বাড়ির বৈঠকে ছিলেন ৯ জন তৃণমূল বিধায়ক। এ প্রসঙ্গে কামারহাটির তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্র বলছেন, 'কয়েকজন করছে, কেউ হোটেলে, কারও বাড়িতে, কোনও বিধায়কের বাড়িতে, কোথাও রুবির পাশের হোটেলে মিটিং করছে। সব খবরই তো আমাদের এসে গেছে।' দলের সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলছেন, 'কোনও একটি হোটেলে কেউ কেউ গিয়ে দেখা করেছেন। সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ। একবার সিপিএম থেকে বিতাড়িত। একবার তৃণমূল থেকে বিতাড়িত। ধন্যবাদ দেব রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে। যে, দলে থেকে কারা অন্য জায়গায় চিঠি দিয়েছে ইত্যাদি, তিনি নিজেই এক্সপোজ করে দিয়েছেন। বিজেপির তো একটা রেকর্ড আছে, মহারাষ্ট্র মডেল থেকে অনেক মডেল আছে।'
আমরা-ওরা বিভাজন
এই পরিস্থিতিতে জোর কানাঘুষো, তৃণমূলের টালমাটাল পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে আমরা-ওরা বিভাজন। এদিক-ওদিক কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, তৃণমূলের ৮০ জয়ী বিধায়কের মধ্যে একটা বড় অংশ নাকি মানছেন না, বিরোধী দলনেতারর নাম বাছাই বিষয়টিকে। রবিবার আরও স্পষ্ট হয়ে যায় বিষয়টি, যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠকে ৮০ বিধায়কের মধ্যে, উপস্থিত হয়েছিলেন মাত্র ২০জন। অন্যদিকে পরাজিত বহু নেতার মন্তব্য প্রকাশ্যে এসেছে, কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সোজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে, কেউ আঙুল তুলেছেন ক্যামাক স্ট্রিটের দিকে। কেউ বলছেন, অভিষেক যেদিন বস হলেন, সেদিনই নাকি তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেক পড়ে গিয়েছিল।
অতীতে কালীঘাট বনাম ক্যামাকস্ট্রিট
প্রসঙ্গত, বাংলার রাজনীতিতে গত কয়েকবছর ধরে 'কালীঘাট বনাম ক্যামাকস্ট্রিট', 'নবীন বনাম প্রবীণ' ফাটল শোনা গিয়েছে বহুবার। এই পরিস্থিতিতে, 'আমরা আসল তৃণমূল' স্লোগান তুলে এখন বিধায়কদের বড় অংশ নাকি মমতা-অভিষেকের বাছাই নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিজেপির দরজা এখন বন্ধ, তাই সোজা ঘাসফুল থেকে পদ্মফুলে ঝাঁপ দেওয়া এখন সম্ভব হচ্ছে না। আবার তার মাঝেই কে ভাল তৃণমূল নয়, তা নিয়েও চলছে অঙ্ক কষা। সূত্রের খবর, এখানেই মিলে যেতে পারে দলনেত্রী মমতার 'মহারাষ্ট্র' আতঙ্ক। সরাসরি বিজেপিতে না গিয়ে, শিবসেনার একনাথ শিন্ডে কিংবা এনসিপির অজিত পাওয়ারের মতো বিক্ষুব্ধ নেতারা পৃথক হয়ে, দলের নাম একই রেখে, বকলমে বিজেপির হাত ধরতে পারেন।