
এদিন ওয়াই চ্যানেলের কাছে বাস স্ট্যান্ডে অস্থায়ী ধর্না মঞ্চ তৈরি করা হয়। সেখানেই বসেন নেতা-নেত্রীরা। এখনও পর্যন্ত নেত্রীর পাশে থাকতে দেখা গিয়েছে, ইন্দ্রনীল সেন, মদন মিত্র, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, মালা রায়, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, অশোক দেব, ডেরেক ও ব্রায়েন, কৃষ্ণা চক্রবর্তীকে। বেশ কয়েকজন কাউন্সিলরকেও দেখা গিয়েছে ধর্না মঞ্চের কাছে। মিছিল নিয়ে আসেন স্বপন সমাদ্দার।
মমতার অভিযোগ
মমতার অভিযোগ, ইডি, সিবিআই দিয়ে ‘ভয়’ দেখিয়ে বিজেপি-কে সমর্থন করার কথা বলা হচ্ছে। গণতন্ত্রের উপর বুলডোজ়ার চালাবেন না। তৃণমূলনেত্রীর কথায়, ‘আমাদের বিধায়ক-সাংসদের ভয় দেখাবেন না। আমাদের লোকদের গ্রেফতার করবে না। আপনাদের অত্যাচারে আত্মহত্যা করছেন। সব জায়গায় চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।’
ধর্নায় বাধা দেওয়া হচ্ছে
মমতা জানান, জীবন-জীবিকা বাঁচানোর জন্য এই ধর্না। মমতার অভিযোগ, ধর্নায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। তার পরেই সেখানে উপস্থিত পুলিশের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘যাঁরা আসছেন, তাঁদের ঢুকতে দিন। না হলে লালবাজার ঘেরাও হবে। নবান্না ঘেরাও হবে। সব থানা ঘেরাও হবে।’ তবে তার পরেই মমতা বলেন, ‘আমি পুলিশকে দোষ দিচ্ছি না। ওদের কোনও ভুল নেই। আমিও প্রশাসনে ছিলাম। ওরা চেয়ারের কথা শোনে। চেয়ার যা বলে তা করে।’ মমতার অভিযোগ, দলীয় বিধায়কদের বাড়ি থেকে বার হতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ গিয়ে তৃণমূল ছাড়ার কথা বলছে। নতুন তৃণমূল তৈরি করতে বলছে। তার পরেই মমতার প্রশ্ন, ‘কারা নতুন তৃণমূল তৈরি করবে? যাঁরা প্রথম থেকে দলের সঙ্গে আছেন তাঁরা নাকি যাঁরা দলের প্রতীকী জিতেছে তাঁরা?’ মমতার অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে ‘বুলডোজ়ার’ রাজনীতি চলছে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে সকলকে।
'আমাকে আটকাতে পারবেন না'
এদিন মমতা বলেন, 'আমাকে আটকাতে পারবেন না। বাংলায় ১৭৭ আসনে ভোটসুট হয়েছে। সংবিধান রক্ষা করব। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব। আমাদের কর্মী-সমর্থকরা আক্রান্ত।'
‘জিয়েঙ্গে তো বিজেপি কো হাটাকে যায়েঙ্গে'
তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, ‘আমি কারও সুদিনে না-হোক, দুর্দিনে আছি।’তাঁর কথায়, ‘বিজেপি বাদে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে। তবে বিজেপির যাঁরা বলেছেন, তাঁদের পাশেও ছিলাম।’ ভোটের পর থেকে তাঁকে আটকানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। এ-ও বলেন, ‘জিয়েঙ্গে তো বিজেপি কো হাটাকে যায়েঙ্গে।’
সরব মমতা
ওয়াই চ্যানেলে ধর্নামঞ্চ থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে সরব রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, দিল্লি থেকে বিজেপি সরকার কলকাঠি নেড়ে তৃণমূলকে ভেঙে দেওয়ার ‘চক্রান্ত’ হচ্ছে। তবে সেই চেষ্টা ‘বানচাল’ করে দেওয়ার বার্তাও দেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, ‘বেআইনি ভাবে আমাদের বিধায়ক, কাউন্সিলর, দলীয় প্রার্থীদের ভয় দেখানো হচ্ছে।' তিনি ঘোষণা করেন, 'আমাদের ধর্না চলবে।’
মঞ্চে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান
ওয়াই চ্যানেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল নেতৃত্বকে ঘিরে রয়েছেন দলীয় কর্মী-সমর্থকেরা। গলনেত্রীর বক্তৃতার সঙ্গে সঙ্গে উঠছে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। তৃণমূল সমর্থকদের চিৎকারে বক্তৃতার মাঝে বার বার থামতে হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। শেষে তিনি জানান, তৃণমূল নেতৃত্ব একে একে বক্তৃতা করবেন।
প্রসঙ্গত, বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে ধরাশায়ী হওয়ার পর এবার ভাঙনের মুখে তৃণমূল কংগ্রেস। বহিষ্কারের পরে মুখ খুলেছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। নাম না করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেছেন তিনি। ঋতব্রত বলছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল হাইজ্যাক হয়ে গিয়েছে। পুরো পার্টিটা হাইজ্যাক করে নিয়েছে একটা কর্পোরেট সংস্থা। পার্টি মানে তো আইপ্যাক। দুর্নীতি নিয়ে একাধিক বার i-Pac-কে জানানো হয়েছিল।’ সূত্রের খবর অন্তত ৫০ জন বিধায়ক বিক্ষুব্ধ রয়েছেন। এই আবহে দলনেত্রীর পাশে ধর্মতলার ধর্না মঞ্চে মমতার পাশে থাকবেন তো সব বিধায়ক? তা নিয়েই অনিয়শ্চতা তৈরি হয়েছে।
প্রসঙ্গত, বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর এই প্রথম রাজপথে নামলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ, মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলায় এক মেগা ধর্না কর্মসূচির ডাক দিয়েছে জোড়াফুল শিবির। প্রথম দিকে জানা গিয়েছিল, ধর্মতলার রানী রাসমণি অ্যাভিনিউতেই তৃণমূলের এই ধর্না কর্মসূচিটি অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু সোমবার রাত পর্যন্ত এই নিয়ে চলে তুমুল নাটক। কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে রানী রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে এই সভার অনুমতি দেওয়া হয়নি। অবশেষে প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘ টানাপোড়েন শেষে শর্তসাপেক্ষে স্থান পরিবর্তন করা হয়। শেষপর্যন্ত কলকাতার ওয়াই (Y) চ্যানেলে মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য এই ধর্না কর্মসূচি করার অনুমতি পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর এই ধর্না কর্মসূচির আগে মঙ্গলবার কালীঘাটে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকে বসেন দলের দুই বিধায়ক কুণাল ঘোষ এবং মদন মিত্র। বৈঠকে ছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেনও। এই বৈঠকে ধর্না কর্মসূচি নিয়ে তো বটেই, দলের ভাঙন রোখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে খবর।
দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে মমতার এই বৈঠকে প্রতিমা মণ্ডল, শুভাশিস চক্রবর্তী এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দেখা গিয়েছে। মূলত দলের ভাঙন রুখতেই এই বৈঠক বলে দলীয় সূত্রে খবর। রবিবার তৃণমূলের যে বৈঠক ছিল, তাতে ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ৬০ জন উপস্থিত ছিলেন, যা পরিষদীয় দলে ফাটলের ইঙ্গিত দেয়। এরপর সই জাল-কাণ্ড নিয়ে দলের অস্বস্তি আরও বেড়েছে। শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করা হলেও, বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা নিয়ে দলের অন্দরেই সন্দেহ দানা বেঁধেছে। কুণাল ঘোষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নির্বাচনের পর দল ছাড়ার প্রবণতা একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা।
দলের প্রবীণ ও ঘনিষ্ঠ নেতারা বিদ্রোহীদের ফেরাতে মরিয়া চেষ্টা চালালেও, দলে ভাঙন আটকানো যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় কাটছে না। আপাতত বিদ্রোহী বিধায়কদের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করতে না পারায় চরম উদ্বেগে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। প্রশ্ন উঠছে, তৃণমূলের পরিষদীয় দলের ভাঙন কি স্রেফ সময়ের অপেক্ষা? দলের রাশ কি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের হাতের বাইরে চলে গেছে? এই প্রশ্নও এখন ক্রমশ জোরাল হচ্ছে। কারণ চৌঠা মে-র পর থেকে তৃণমূলের ওপর থেকে নীচ-সর্বত্র শুধু বিদ্রোহ। সাংসদ, বিধায়ক, কাউন্সিলর-কেউ বাদ নেই। কেউ তৃণমূলের মাথা বদলানোর দাবি করছেন। কেউ ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে পদ ছাড়ছেন। এমনকী, খোদ মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের ডাকা বৈঠকে ক্রমশ কমছে বিধায়কদের হাজিরার সংখ্যা। ফল ঘোষণার পর ৬ মে, কালীঘাটের বাড়িতে তৃণমূলনেত্রী যে বৈঠক ডেকেছিলেন, সেখানে জয়ী ৮০ জনের মধ্য়ে উপস্থিত ছিলেন ৭১ জন। ১৯ মে, দ্বিতীয় বৈঠকে, সেই সংখ্য়াটাই নেমে আসে ৬৫-তে। আর ৩১ মে, তা একেবারে তলানিতে গিয়ে দাঁড়ায় ২০-তে।