
দুর্গাপুজোয় আমিষ খাওয়া চলবে না? মণ্ডপের আশপাশে বসবে না ননভেজ খাবারের স্টল? বিশ্ব হিন্দু পরিষদের 'বিশেষ গাইডলাইন' নিয়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে বাংলায়। রাজ্যে পালাবদলের পর এটাই প্রথম দুর্গোৎসব। সেই প্রভাব পড়েছে পুজোতেও। বদলেছে অধিকাংশ কমিটি। কিন্তু এবার কি বদলে যাবে উৎসবের চিরাচরিত ছবিটাও?
দুর্গাপুজোয় আমিষ বন্ধ?
পুজো মণ্ডপের আশপাশে কি সত্যিই ননভেজ বিক্রি হবে না? নিরামিষ হবে এবারের দুর্গাপুজো? এ প্রসঙ্গে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দক্ষিণবঙ্গের প্রচার প্রসার প্রমুখ রক্তিম দাস বলেন, 'আমরা আমিষ বন্ধ করার কথা বলিনি। মিথ্যে ন্যারেটিভ ছড়ানো হচ্ছে। স্বামী নির্গুণানন্দজি যেটা বলেছেন, পুজো মণ্ডপের মধ্যে খাবার নিয়ে প্রবেশ করে এঁটো কাঁটা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, সেটা যেন না হয়। মণ্ডপের মধ্যে যেন একটা পবিত্রতা থাকে।'
পিতৃপক্ষে পুজো উদ্বোধনে আপত্তি
রক্তিম দাস বলেন, 'শাস্ত্রীয় মতে পুজো করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি আমরা, কোনও ফতোয়া জারি করিনি।' পূর্বের সরকারের আমলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা যেত মহালয়ার আগে থেকেই পুজো উদ্বোধন করতে। এই নিয়ে একাধিকবার আপত্তিও তুলেছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এবার BJP সরকারের আমলে যে এমনটা আর হবে না, সে কথা স্পষ্ট হয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বক্তব্যেই। নির্গুণানন্দ বলেন, 'চক্ষুদান বা প্রদীপ জ্বালিয়ে উদ্বোধন নয়। বোধন আর উদ্বোধনে পার্থক্য আছে। প্রতিপদ অর্থাৎ দেবীপক্ষের পর থেকে পুজো শুরু হওয়া উচিত।' হিন্দু শাস্ত্র মেনে ঐতিহ্যের পুজো পালন হোক, এমনটাই চাইছে VHP।
থিম প্যান্ডেল বন্ধ?
তবে ‘আর্ট’-এর নামে যা খুশি তা-ই চালিয়ে দেওয়া সহ্য করা হবে না। এমনটাই জানিয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তাদের সাফ কথা, 'থিমের নাম করে ডিমের প্যান্ডেল চলবে না।' এ প্রসঙ্গে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দক্ষিণবঙ্গের প্রচার প্রসার প্রমুখ রক্তিম দাস বলেন, 'কেউ মা দুর্গাকে পরিযায়ী শ্রমিত বানিয়ে দিচ্ছে। দেবী দুর্গার তো বিভিন্ন রূপ রয়েছে, সেই মতো করা হোক।' তবে থিমের বিরোধিতা তাঁরা করছেন না বলে দাবি রক্তিম দাসের। তিনি বলেন, 'শিল্প হোক আমরা চাই। থিমের বিরোধী নই আমরা। আধুনিক থিম হোক। মন্দিরের আদলে প্যান্ডেল হোক। ঋষি কল্পিত মাতৃরূপ রয়েছে, চোখ বন্ধ করলেই সেই রূপ আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। তা কখনও পরিযায়ী শ্রমিক হয় কি? হাত থেকে অস্ত্র খুলে জুতো-চটি গুঁজে দেওয়া হচ্ছে। এমনটা দেখলে কি মাতৃ ভাব জাগবে। তাই আমরা শাস্ত্রসম্মত ভাবে পুজো করার প্রস্তাব দিয়েছি।'
তবে কি থিম পুজো বন্ধ করে দেবে VHP? রক্তিম দাস বলেন, 'থিমের নামে মাতৃ মূর্তি বিকৃত হলে আমরা অবশ্যই প্রতিবাদ করব। তার মানে এই নয় যে পুজো বন্ধ করে দিতে যাব।'
সাবেকী প্রতিমা ছাড়াও থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দুর্গা প্রতিমা দেখতে এখন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে বাঙালি। আর সেখানেই আপত্তি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের। মূর্তির মধ্যে যেন ‘মাতৃত্ব’ ও ‘শালীনতা’ বজায় থাকে। রণংদেহী দুর্গাকে ‘বিধবা শাড়ি’ পরিয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া কিংবা দশ হাতের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে আজব কিছু গুঁজে দেওয়ার মতো ‘শিল্প রসিকতা’ একদমই বরদাস্ত করা হবে না, সাফ জানিয়েছে VHP।
কী বলছে পুজো কমিটিগুলি?
২০২০ সালের পুজোয় বেহালার বরিষা ক্লাব করোনাকালীন লকডাউনের চরম সঙ্কটে পড়া পরিযায়ী শ্রমিক এবং লড়াকু মা-কে শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই আদলেই প্রতিমা তৈরি করেছিল। সনাতন প্রতিমার বদলে দেখা যায় কোলে শিশু নিয়ে পরিযায়ী জননী হেঁটে চলেছেন। দেবীর হাতে কোনও অস্ত্র ছিল না, ছিল ত্রাণের ব্যাগ। চিত্রশিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যের কাজের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই প্রতিমাটি তৈরি করেছিলেন কৃষ্ণনগরের ভাস্কর পল্লব ভৌমিক। মূল থিম মেকার ছিলেন রিন্টু দাস। এই মূর্তি নিয়েই তীব্র আপত্তি তুলেছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ।
যদিও বর্তমানে বরিষা ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট অনিমেষ চক্রবর্তী বলেন, 'আমরা শুধু করিনি। এমন মানুষের মূর্তি অনেকেই করেছেন। তবে এই নিয়ে আমরা কোনও মন্তব্য করতে চাই না। বিতর্কিত বিষয় নিয়ে কিছু বলব না। যদি ওঁরা (VHP) আমাদের এই নিয়ে কিছু বলেন তবে আমরা উত্তর দেব।'
বরাবরই অভিনব থিমে চমক দেয় নাকতলা উদয়ন সঙ্ঘ। VHP-র থিম পুজো নিয়ে বক্তব্য প্রসঙ্গে এই পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন দাস বলেন, 'আমরা থিম পুজো বরাবরই করি, নতুন কিছু নয়। থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ বছরও প্রতিমা তৈরি হবে। তবে এ বছর আমরা পঞ্জিকা নিয়ে কাজ করছি। তাই এবার আমাদের প্রতিমা সাবেকিই হবে। কোনওবারই আমরা বিকৃত কোনও প্রতিমা তৈরি করি না। মা-কে যেমন ভাবে মানুষ দেখে, অশাস্ত্রীয় মূর্তি কি কেউ করে নাকি। অশালীন কিছু নিশ্চয়ই করা উচিত নয়। শাড়ির ডিজাইন ভিন্ন ভিন্ন হতেই পারে আর্ট ফর্ম অনুযায়ী।' আমিষ খাবার প্রসঙ্গে অঞ্জন দাস বলেন, 'কোনও মানুষ কি আমিষ খাবার নিয়ে মণ্ডপের ভিতর ঢোকেন? ওঁরা বলেছে যাতে মণ্ডপের মধ্যে নোংরা না করা হয়।'