
রাজ্যে ক্ষমতায় এসেই পুলিশ প্রশাসনকে 'হাত খুলে কাজ করতে হবে' বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ইতিমধ্যে রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতার পুলিশ কমিশনার, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেছেন তিনি। মূল লক্ষ্য যে সুশাসন, নবান্নে পুলিশ-প্রশাসনের শীর্ষস্তরের বৈঠকে তা স্পষ্ট করে দিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এরপরেই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও নিয়ন্ত্রণ করতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বড়সড় পদক্ষেপ নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। সেইসঙ্গে একগুচ্ছ কঠোর নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।
এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) রাজ্যের সমস্ত পুলিশ কমিশনার (কলকাতা বাদে), জেলা পুলিশ সুপার এবং রেল পুলিশ সুপারদের পাঁচ দফার নির্দেশিকা পাঠিয়েছেন। যেখানে ট্রাফিক আইন থেকে শুরু করে সীমান্ত সুরক্ষা - সব ক্ষেত্রেই কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
২০২১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী মামলার পর্যালোচনা
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক হিংসা সংক্রান্ত পুরনো মামলাগুলি নতুন করে খতিয়ে দেখতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা পড়েছে, সেগুলিও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ পাওয়া গেলে সেইসব মামলার ফের পূর্ণাঙ্গ তদন্তেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে থানায় জমা পড়া জিডি এবং বিভিন্ন অভিযোগও আবার পরীক্ষা করে দেখার উল্লেখও রয়েছে নির্দেশিকায়। প্রাথমিক তদন্তে অপরাধের প্রমাণ মিললে নতুন মামলা দায়ের করতে হবে। এই সমস্ত তদন্ত ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করবেন জেলা পুলিশ সুপার এবং পুলিশ কমিশনাররা।
সীমান্ত সমন্বয় ও গোয়েন্দা তথ্য
সীমান্ত এলাকায় পাচার এবং অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেও কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত সীমান্ত বৈঠক করতে বলা হয়েছে। যাতে সক্রিয় অপরাধী চিহ্নিত, সীমান্ত পাচারচক্র রোধ এবং গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদানের উপর জোর দেওয়া যায়। সেইসঙ্গে থানা পর্যায়ে মাসিক এবং এসডিপিও পর্যায়ে প্রতি তিন মাস অন্তর সমন্বয় বৈকক অনুষ্ঠিত হবে। আইজি, আইবি (বর্ডার) এই বৈঠকগুলোর রেকর্ড সংরক্ষণ করবেন। চিহ্নিত অপরাধী ও দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই হবে এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য।
গরু পাচার ও তোলাবাজি রুখতেও কড়া অবস্থান
অন্যদিকে, গত কয়েক বছরে রাজ্যে সবথেকে আলোচিত বিষয় অর্থাৎ গরু পাচার ও তোলাবাজি রুখতেও পুলিশকে কড়া অবস্থান নিতে বলা হয়েছে। নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, কোনও ভাবেই অবৈধ গবাদি পশুর হাট বা কসাইখানা চালানো যাবে না। পাশাপাশি বেআইনি খনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও কড়া পদক্ষেপ করতে হবে। তবে সরকার এও নিশ্চিত করতে চায় যে, বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীরা যেন কোনও ভাবেই স্থানীয় দুষ্কৃতী বা তোলাবাজদের খপ্পরে না পড়েন। এই ক্ষেত্রে 'অ্যানিম্যাল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট, ২০১৪' বা পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছে।
অস্ত্রশস্ত্রের হিসাব এবং তল্লাশি অভিযান
রাজ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে অস্ত্রশস্ত্রের হিসাব এবং তল্লাশি অভিযানের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ১৫ মে-র মধ্যে প্রতিটি থানার মালখানায় জমা থাকা সমস্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ খতিয়ে দেখতে হবে আইসি বা ওসিদের। তাঁরা নিজে উপস্থিত থেকে রেজিস্টারের সঙ্গে সমস্ত অস্ত্রের মিল পরীক্ষা করবেন। এর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ১৬ মে থেকে টানা দুই সপ্তাহ ধরে রাজ্যজুড়ে অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হবে।
ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট
এই নির্দেশিকার সবথেকে উল্লেখযোগ্য অংশটি হল ট্রাফিক ব্যবস্থা। রাস্তায় বাইক নিয়ে বেরোলে এখন থেকে হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক। মোটর ভেহিক্যাল অ্যাক্ট বা মোটর যান আইন অনুযায়ী এই নিয়ম পালনে যাতে কোনও খামতি না থাকে, তার জন্য রাজ্যজুড়ে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গোটা বিষয়টি সরাসরি জেলা পুলিশ সুপার এবং কমিশনারদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এডিজি (ট্রাফিক) নিয়মিত এই অভিযানের তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং প্রতি মুহূর্তের রিপোর্ট জমা দিতে হবে এডিজি (সিআইডি)-র দফতরে।
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও মজবুত করতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের পক্ষ থেকে পাঁচ দফার এই বিশেষ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে । প্রশাসনিক মহলের মতে, এই পাঁচ দফার নির্দেশিকা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার পথে তা হবে এক মাইলফলক।