
গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ আর প্যাঁচপেঁচে গরমে যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন ভারী বা মশলাদার খাবার দেখলেই যেন অরুচি ধরে। এমন তপ্ত দুপুরে বাঙালির পাতে যদি ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে এক বাটি 'বড়ি দিয়ে লাউয়ের ঘণ্ট' থাকে, তবে নিমেষেই শরীরে ও মনে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা নেমে আসে। লাউ এমনিতে শরীর ঠান্ডা রাখে। ক্যালোরি প্রায় নেই বললেই চলে, অথচ পুষ্টি আর জলের জোগান দিতে এর জুড়ি মেলা ভার। তাই গ্রীষ্মকালের আদর্শ সবজি হিসেবে লাউ বরাবরই বাঙালির রান্নাঘরে রাজত্ব করে এসেছে।
বাঙালির রান্নাঘরের এক অনন্য সৃষ্টি হল ‘ঘণ্ট’, ‘চচ্চড়ি’ বা ‘ছেঁচকি’। সেকালের দিদিমা-ঠাকুমাদের রন্ধনশৈলী সত্যিই অবাক করার মতো। বাঙালির বহু-পদ বিশিষ্ট আহারের থালায় পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে তাঁরা এমন কিছু চটজলদি অথচ সুস্বাদু পদের উদ্ভাবন করেছিলেন, যা আজও অমলিন। নিরামিষ রান্নার মধ্যে বড়ি দিয়ে লাউয়ের ঘণ্ট এমনই এক চিরায়ত পদ, যা খুব কম সময়েই তৈরি হয়ে যায়, অথচ স্বাদে তার কোনো তুলনা হয় না।
এই পদের মূল আকর্ষণ হল নরম, মজে যাওয়া লাউয়ের সঙ্গে মুচমুচে বড়ির যুগলবন্দি। কলাই ডাল বা বিউলির ডালের বড়ি কড়াইতে সর্ষের তেলে লালচে করে ভেজে তুলে নেওয়ার গন্ধেই যেন অর্ধেক খিদে বেড়ে যায়। তবে বড়ি ভাজার সময় একটু খেয়াল রাখা জরুরি, যাতে পুড়ে তেতো না হয়ে যায়। সোনালী রং ধরলেই তা নামিয়ে নেওয়া উচিত।
রান্নার পদ্ধতিটিও বেশ ছিমছাম। প্রথমে লাউটিকে খোসা ছাড়িয়ে দেশলাই কাঠির মতো সরু সরু (ঝিরিঝিরি) করে কেটে নিতে হবে। কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে তাতে জিরে আর তেজপাতার ফোড়ন দিতে হয়। ফোড়নের সুগন্ধ বেরোলে কেটে রাখা লাউ দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে ঢাকা দিয়ে আঁচ কমিয়ে দিন। লাউয়ের নিজস্ব জলেই লাউ সেদ্ধ হবে, আলাদা করে জল দেওয়ার একেবারেই কোনো প্রয়োজন নেই।
মিনিট কয়েক পর লাউয়ের জল ছেড়ে যখন সবজিটা মজে আসবে, তখন তাতে স্বাদমতো নুন, সামান্য মিষ্টি (বাঙালির নিরামিষ রান্নায় একটু চিনি না দিলে কি স্বাদ খোলে!), আর বেশ খানিকটা কোরানো বা বাটা আদা দিয়ে কষিয়ে নিতে হবে। নামানোর ঠিক আগে এক চামচ গাওয়া ঘি আর সেই ভেজে রাখা বড়িগুলো আধভাঙা করে ছড়িয়ে দিয়ে হালকা হাতে মিশিয়ে নিলেই রান্না শেষ।
অনেক সময় এমন হয় যে ঘরে কলাই ডালের বড়ি বাড়ন্ত। সে ক্ষেত্রে মুসুর ডালের বড়ি দিয়েও এই পদটি দিব্যি রেঁধে ফেলা যায়। আর যদি হাতের কাছে কোনো বড়িই না থাকে? চিন্তা নেই! নামানোর আগে এক মুঠো কোড়ানো টাটকা নারকেল ছড়িয়ে দিন। নারকেলের নিজস্ব মিষ্টতা আর ক্রিমি ভাব এই লাউয়ের ঘণ্টকে এক রাজকীয় মাত্রা দেবে।
দুপুরের মেনুতে এক থালা সাদা ভাত, সঙ্গে এই বড়ি দিয়ে লাউয়ের ঘণ্ট, একটু ডাল আর শেষ পাতে কাঁচা আমের টক— গ্রীষ্মের দুপুরে এর চেয়ে বেশি আরামদায়ক আর তৃপ্তিদায়ক আহার আর কী বা হতে পারে! নিরামিষ দিনের এই সহজ অথচ অসাধারণ পদটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় শিকড়ের টান, আর ফেলে আসা সেই একান্নবর্তী পরিবারের রান্নাঘরের চেনা গন্ধ।
তাই এই গরমে শরীরকে স্নিগ্ধ আর রসনাকে তৃপ্ত করতে আজই মেনুতে রাখতেই পারেন বাঙালির সাধের 'বড়ি দিয়ে লাউয়ের ঘণ্ট'।