
বাঙালির হেঁশেলে মাছের একচেটিয়া আধিপত্য চিরকালের। সেখানে ইলিশের আভিজাত্য যেমন আছে, তেমনই চিংড়ির প্রতি বাঙালির দুর্বলতাও কিছু কম নয়। ছুটির দুপুরে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে যদি পাতে পড়ে কলাপাতা মোড়া সর্ষে চিংড়ির পাতুড়ি, তবে রবিবারের দুপুরটা যেন একেবারে জমে ক্ষীর! সর্ষের ঝাঁজ, কোরানো নারকেলের হালকা মিষ্টি স্বাদ, আর কাঁচা সর্ষের তেলের সোঁদা গন্ধ— সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত রসনাতৃপ্তি।
রেস্তরাঁর মতো স্বাদ পেতে গেলে যে সবসময় খুব ঝক্কি পোহাতে হয়, এমনটা কিন্তু নয়। বরং সামান্য কয়েকটি উপকরণেই নিজের বাড়ির রান্নাঘরেই তৈরি করে ফেলতে পারেন এই জিভে জল আনা পদ। রইল সাবেকি চিংড়ি পাতুড়ির সহজ রেসিপি।
কী কী লাগবে?
মাছ: বাগদা বা গলদা চিংড়ি (খোসা ছাড়ানো) - ৫০০ গ্রাম
মশলাপাতি: কালো ও সাদা সর্ষে মিলিয়ে ৩ টেবিল চামচ, পোস্ত ১ টেবিল চামচ (ঐচ্ছিক, তবে দিলে স্বাদ বাড়ে)
অন্যান্য অনুষঙ্গ: কোরানো নারকেল আধা কাপ, কাঁচা লঙ্কা ৫-৬টি, হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো
তেল: সর্ষের তেল (পরিমাণমতো, পাতুড়িতে তেলের ব্যবহার একটু বেশিই হয়)
পাতা: কলাপাতা (বড় টুকরো করে কাটা) ও বাঁধার জন্য সুতো
তৈরি করবেন কীভাবে?
প্রথমেই চিংড়ি মাছগুলোর খোসা ও শির ছাড়িয়ে ভালো করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিন। মাছে সামান্য নুন ও হলুদ মাখিয়ে মিনিট দশেকের জন্য আলাদা করে সরিয়ে রাখুন।
এবার আসি মশলার কথায়। কালো আর সাদা সর্ষে, পোস্ত, সামান্য নুন আর গোটা দুয়েক কাঁচা লঙ্কা একসঙ্গে শিলে বা মিক্সিতে একেবারে মসৃণ করে বেটে নিতে হবে। সর্ষে বাটার সময় একটু নুন আর কাঁচা লঙ্কা দিলে সর্ষের তেতো ভাবটা কেটে যায়।
এর পর একটি বড় পাত্রে নুন-হলুদ মাখানো চিংড়িগুলো নিয়ে তাতে সর্ষে-পোস্ত বাটা, কোরানো নারকেল, চেরা কাঁচা লঙ্কা, পরিমাণমতো হলুদ, স্বাদ অনুযায়ী নুন এবং বেশ খানিকটা কাঁচা সর্ষের তেল দিয়ে খুব ভালো করে মাখিয়ে নিন। মশলা মাখানো মাছটি ঢাকা দিয়ে অন্তত আধ ঘণ্টা ম্যারিনেট হতে দিন। মশলার স্বাদ মাছের ভেতরে ঢোকার জন্য এই সময়টুকু দেওয়া খুব জরুরি।
পাতুড়ির আসল জাদু কিন্তু কলাপাতায়। বাজার থেকে আনা কলাপাতাগুলো মাঝারি টুকরো করে কেটে ভালো করে ধুয়ে মুছে নিন। এবার পাতাগুলোকে মাঝারি আঁচে একটু সেঁকে নিতে হবে। এতে পাতা নরম হয়, মোড়ার সময় সহজে ফেটে যায় না।
সেঁকে নেওয়া কলাপাতার ঠিক মাঝখানে এক বা দু'টো চিংড়ি ও বেশ খানিকটা মশলা দিয়ে, তার ওপর একটা চেরা কাঁচা লঙ্কা ও কয়েক ফোঁটা কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে দিন। এবার চারদিক থেকে কলাপাতাটা খামের মতো মুড়ে সুতো দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলুন, যাতে ভেতরের মশলা কোনোভাবেই বাইরে বেরিয়ে আসতে না পারে।
সব কটি পাতুড়ি তৈরি হয়ে গেলে, গ্যাসে একটি চাটু বা নন-স্টিক প্যান বসিয়ে তাতে অল্প সর্ষের তেল ব্রাশ করে নিন। তেল গরম হলে আঁচ একেবারে কমিয়ে পাতুড়িগুলো প্যানে সাজিয়ে ঢাকা দিয়ে দিন। মিনিট দশেক পর ঢাকা খুলে সাবধানে পাতুড়িগুলো উল্টে দিয়ে ফের ঢাকা দিন। আরও ৭-৮ মিনিট পর কলাপাতাগুলো একটু কালচে হয়ে পোড়া পোড়া গন্ধ বেরোলেই বুঝবেন আপনার চিংড়ি পাতুড়ি পরিবেশনের জন্য একদম তৈরি।
খাওয়ার ঠিক আগে সুতোর বাঁধন কাটলেই ভাপানো সর্ষে আর মাছের যে যুগলবন্দির সুবাস সারা ঘরে ছড়াবে, তাতেই অর্ধেক খিদে বেড়ে যাবে। এবার গরম ভাতের সঙ্গে শুধু মেখে খাওয়ার অপেক্ষা!