
বাঙালির খাদ্যরসিক সত্তায় ঘটি এবং বাঙালের রেষারেষি এক চিরন্তন সত্য। এপার বাংলা আর ওপার বাংলার এই অলিখিত যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি জমে ওঠে খাবার টেবিলে। চিংড়ির মালাইকারি বনাম ইলিশের ভাপার সেই চিরাচরিত তর্কের মাঝেই নীরবে নিজের রাজকীয় উপস্থিতি জাহির করে এক বিশেষ মৎস্য— চিতল।
পশ্চিমবঙ্গের সাবেকি ঘটি পরিবারে চিতল মাছের কদর মূলত তার 'পেটি'-র জন্য। সর্ষে-পোস্ত বা কড়া কালিয়ায় মাখা তেলতেলে চিতলের পেটি ছাড়া তাদের রবিবার অসম্পূর্ণ। কিন্তু এই মাছের যে অংশটিতে কাঁটার আধিক্য, সেই 'গাদা' বা পিঠের দিকটা দেখলে অনেকেই প্রমাদ গোনেন। কাঁটা বেছে খাওয়ার ভয়ে এবং প্রস্তুতির প্রবল ঝক্কির কারণে ঘটি হেঁশেলে এই গাদার প্রবেশাধিকার প্রায় থাকে না বললেই চলে।
কিন্তু কাঁটাময় গাদাকে বাতিল করে দেওয়ার এই ঘটি-বিলাসিতাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে পূর্ববঙ্গের রন্ধন শৈলী। বাঙাল হেঁশেলের জাদুতে এই অবহেলিত গাদাই হয়ে ওঠে এক অনবদ্য শিল্প— 'চিতল মাছের মুইঠ্যা'।
কথিত আছে, দুই বাংলার বৈবাহিক আদানপ্রদানের মাধ্যমেই এই পদটির বিস্তার। ঘটি বাড়ির মেয়ে যখন বাঙাল পরিবারে বধূ হয়ে যায়, তখন শাশুড়ি মায়ের হাতের এই অভিনব পদটি তার কাছে এক নতুন জগতের দরজা খুলে দেয়। মাছের কাঁটা থেকে চামচ দিয়ে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে শাঁসটুকু কুরে বের করে নেওয়ার যে হাড়ভাঙা খাটনি, তা নিমিষেই সার্থক হয়ে যায় মশলাদার লালচে গ্রেভিতে ডোবানো নরম ডাম্পলিংগুলো মুখে দিলে।
'মুইঠ্যা' শব্দটি এসেছে 'মুঠো' বা 'মুঠি' থেকে। হাতের তালুতে মাছের কিমা নিয়ে আলতো চাপে মুঠো করে যে আকার দেওয়া হয়, তা থেকেই এই সাবেকি নামকরণ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পূর্ববঙ্গের মা-ঠাকুমারা পরম মমতায় এই পদটি রাঁধতে শিখিয়েছেন। আজ, যখন ব্যস্ততার অজুহাতে রান্নাঘর থেকে এই ধরনের সময়সাপেক্ষ পদগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন এই সাবেকি রেসিপিগুলো সযত্নে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। রবিবারের আড্ডায় বা বিশেষ কোনও উৎসবের দিনে, পাতে যদি পড়ে এই ঐতিহ্যবাহী মুইঠ্যা, তবে বাঙালির রসনাতৃপ্তি এক অন্য মাত্রায় পৌঁছয়। জেনে নিন সেই চিরকালীন রেসিপি।
সাবেকি চিতল মাছের মুইঠ্যা
মুইঠ্যা তৈরির উপকরণ:
চিতলের গাদা: ৫০০ গ্রাম
সিদ্ধ আলু: ১টি (মাঝারি মাপের)
পেঁয়াজ বাটা: ১ টেবিল চামচ
আদা ও রসুন বাটা: ১ চা চামচ করে
কাঁচা লঙ্কা কুচি: ১ চা চামচ
হলুদ, জিরে ও গরম মশলা গুঁড়ো: আধ চা চামচ করে
কাঁচা সর্ষের তেল: ১ টেবিল চামচ
নুন ও সামান্য চিনি: স্বাদ অনুযায়ী
কালিয়া বা গ্রেভির উপকরণ:
ডুমো করে কাটা আলু: ২টি
পেঁয়াজ বাটা: ২ টেবিল চামচ
আদা ও রসুন বাটা: ১ চা চামচ করে
টোম্যাটো বাটা: ১টি বড় মাপের
গোটা গরম মশলা: ছোট এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ ও তেজপাতা
গুঁড়ো মশলা: হলুদ, কাশ্মীরি লঙ্কা, জিরে ও ধনে গুঁড়ো (১ চা চামচ করে)
ফেটিয়ে নেওয়া টক দই: ২ টেবিল চামচ
গাওয়া ঘি ও গরম মশলা গুঁড়ো: ১ চা চামচ করে
সর্ষের তেল, নুন ও চিনি: পরিমাণমতো
রন্ধন প্রণালী:
১. মুইঠ্যার প্রস্তুতি ও ভাপানো পর্ব
চিতল মাছের গাদা থেকে চামচ দিয়ে সযত্নে কুরে কুরে মাছের শাঁসটুকু বের করে নেওয়াটাই এই রান্নার প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ। খেয়াল রাখতে হবে যেন একটিও কাঁটা না থাকে। একটি বড় পাত্রে সেই মাছের শাঁস, সিদ্ধ আলু, পেঁয়াজ-আদা-রসুন বাটা, কাঁচা লঙ্কা, সমস্ত গুঁড়ো মশলা, নুন, সামান্য চিনি ও কাঁচা সর্ষের তেল দিয়ে খুব ভালো করে মেখে নিতে হবে।
এরপর হাতের তালুতে সামান্য তেল বুলিয়ে, মিশ্রণটি থেকে ছোট ছোট মণ্ড নিয়ে হাতের মুঠোয় চেপে মুইঠ্যার আকার গড়তে হবে। একটি চওড়া পাত্রে নুন দেওয়া ফুটন্ত জলে এই মুইঠ্যাগুলো সাবধানে ছেড়ে দিতে হবে। মিনিট সাতেক পর সেগুলো ভেসে উঠলেই জল থেকে তুলে জল ঝরিয়ে নিতে হবে।
২. ভাজার পর্ব
কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে ভাপিয়ে রাখা মুইঠ্যাগুলো হালকা সোনালি রং ধরিয়ে ভেজে তুলে রাখতে হবে। অতিরিক্ত কড়া করে ভাজলে মুইঠ্যার ভেতরের তুলতুলে ভাব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। একই তেলে ডুমো করে কাটা আলুগুলোও লালচে করে ভেজে তুলে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
৩. কালিয়া নির্মাণ
অবশিষ্ট তেলে গোটা গরম মশলা ও তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ বাটা যোগ করতে হবে। পেঁয়াজের রং ধরলে আদা-রসুন বাটা ও টোম্যাটো বাটা দিয়ে কষানোর পালা। কাঁচা গন্ধ চলে গেলে সামান্য জলে গোলা সমস্ত গুঁড়ো মশলা কড়াইতে দিতে হবে। মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে, আঁচ একদম কমিয়ে ফেটানো টক দই মিশিয়ে দিতে হবে।
মশলা সুচারুভাবে কষানো হলে ভেজে রাখা আলু, পরিমাণমতো গরম জল, নুন ও চিনি দিয়ে ঢাকা দিতে হবে। আলু সিদ্ধ হয়ে এলে ভেজে রাখা মুইঠ্যাগুলো গ্রেভিতে সাবধানে ছেড়ে দিতে হবে। মাঝারি আঁচে কিছুক্ষণ ফোটার পর, ঝোল যখন মাখো মাখো হয়ে আসবে, তখন উপর থেকে গাওয়া ঘি এবং গরম মশলা ছড়িয়ে আঁচ বন্ধ করে দিতে হবে।
মিনিট পাঁচেক ঢাকা দিয়ে রাখার পর, গরম সাদা ভাত বা পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন বাংলার এই হারিয়ে যেতে বসা রত্ন- চিতল মাছের মুইঠ্যা।