
এপ্রিলের তীব্র দাবদাহে, যখন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনন্দিন রুটিনই সবার আগে প্রভাবিত হয়। সাধারণত গ্রীষ্মকালে ভাজাভুজি ও মশলাদার খাবারের পরিবর্তে হালকা খাবার খাওয়াই শ্রেয়। এর ফলে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে অনেকের মনেই বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নটি হল-এই ঋতুতে দেশি ঘি খাওয়া উচিত কিনা। অনেকেরই ধারণা যে, ঘি শরীরের উষ্ণতা বা তাপ বাড়িয়ে দেয়; তাই খাদ্যতালিকা থেকে এটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত।
তবে, পরিমিত পরিমাণে খেলে দেশি ঘি শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে প্রচুর পরিমাণে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট বা চর্বি থাকে, যা শরীরে শক্তি জোগায় এবং হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, ঘি শরীরের ভেতর থেকে আর্দ্রতা বা পিচ্ছিল ভাব বজায় রাখে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখে, যার ফলে হজম প্রক্রিয়া উন্নত হয়।
গবেষণা কী বলছে?
'দ্য জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন'-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ঘিতে 'বিউটিরেট' (butyrate) নামক এক ধরণের 'শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড' থাকে। এই উপাদানটি অন্ত্রের প্রদাহ কমাতে এবং পরিপাকতন্ত্রের দেয়ালকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। গ্রীষ্মকালে বুক জ্বালা এবং অ্যাসিডিটির সমস্যা থেকে মুক্তি দিতেও এটি বেশ কার্যকর।
এদিকে, 'ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন' (NCBI)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘি চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলো (যেমন—A, D, E এবং K) শোষণে সহায়তা করে। এর অর্থ হল, গ্রীষ্মকালে আপনি যখন ফলমূল ও শাকসবজি খান, তখন সেই খাবারগুলোর পুষ্টি উপাদান আপনার শরীরে পৌঁছে দিতে ঘি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আয়ুর্বেদ কী বলছে?
আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘি-এর প্রভাব বা গুণাগুণ হল শীতল। এটি শরীরের পিত্ত দোষ প্রশমিত করে এবং অ্যাসিডিটি, বুকজ্বালা ও শরীরের অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা কমাতে সাহায্য করে। তাই গ্রীষ্মকালে পরিমিত পরিমাণে ঘি গ্রহণ করাকে অত্যন্ত উপকারী হিসেবে গণ্য করা হয়।
কতটা খাওয়া উচিত?
গ্রীষ্মকালে প্রতিদিন এক থেকে দুই চা-চামচ ঘি খাওয়াই যথেষ্ট। এর চেয়ে বেশি পরিমাণে খেলে শরীরে ভারী ভাব, অলসতা বা অতিরিক্ত উষ্ণতা অনুভূত হতে পারে; তাই অতিরিক্ত পরিমাণে ঘি খাওয়া থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি।
ঘি খাওয়ার সঠিক নিয়ম
ঘি খাওয়ার সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর উপায় হল—গরম রুটির সঙ্গে ডাল মিশিয়ে খাওয়া, অথবা রুটিতে সামান্য ঘি মাখিয়ে খাওয়া। দিনের শুরুর দিকে বা সকালের দিকে ঘি খেলে তা সহজে হজম হয় এবং সারাদিন শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে। অনেকে সকালে খালি পেটে হালকা গরম জলের সঙ্গে ঘি মিশিয়ে পান করেন; তবে সবার জন্য এটি জরুরি নয়। তাই নিজের শারীরিক গঠন বা প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে ঘি গ্রহণ করা উচিত।
কোন বিষয় মনে রাখা জরুরি?
গ্রীষ্মকালে ভাজাভুজি বা তৈলাক্ত খাবারের সঙ্গে ঘি মিশিয়ে খাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আপনার যদি ইতিমধ্যেই অ্যাসিডিটি, গ্যাসের সমস্যা কিংবা হজমজনিত কোনও সমস্যা থাকে, তবে ঘি খাওয়ার পরিমাণ সীমিত রাখুন। সর্বদা খাঁটি ও দেশি ঘি ব্যবহার করুন; ভেজাল ঘি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
কারা সতর্ক থাকবেন?
যাদের স্থূলতা (ওবেসিটি), উচ্চ কোলেস্টেরল এবং লিভার-সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, তাদের ঘি খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গ্রীষ্মকালে ঘি পুরোপুরি এড়িয়ে চলার কোনও প্রয়োজন নেই। ঘি কেবল শরীরের উষ্ণতা বা তাপ বৃদ্ধি করে—এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। সঠিক পরিমাণে এবং সঠিক পদ্ধতিতে গ্রহণ করা হলে, ঘি কেবল আপনার খাবারের স্বাদই বৃদ্ধি করে না; বরং এটি হজমশক্তি উন্নত করতে, শরীরে শক্তি জোগাতে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপের ভারসাম্য বজায় রাখতেও সহায়তা করে।