
বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ভারতীয় খাবার। এদেশের একেক রাজ্যের ভিন্ন পদ সময়ে সময়ে বিশ্ব দরবারে হয়ে উঠেছে 'হট ফেভারিট'। এবার সেই মুকুটে আরও একটি পালক জুড়ল। এক কাপ গরম চায়ে চুমুক দিলে নিমেষেই উধাও হয়ে যায় যাবতীয় ক্লান্তি। আর সেই চা যদি হয় কড়ক মশলা চা, তবে তো কথাই নেই! বাঙালি থেকে শুরু করে আপামর ভারতবাসীর এই চিরন্তন আবেগে এবার সিলমোহর দিল জনপ্রিয় গ্লোবাল ফুড গাইড ‘টেস্টঅ্যাটলাস’ (TasteAtlas)। তাদের প্রকাশিত বিশ্বের সেরা ১০০টি চায়ের তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে নিল ভারতের মশলা চা। অর্থাৎ, পাড়ার মোড়ের 'চায়ে পে চর্চা'এখন আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বমঞ্চে!
ভারতে চা কেবল একটি পানীয় নয়, এটি একটি সংস্কৃতি। রাস্তার ধারের টপরি থেকে শুরু করে অভিজাত রেস্তোরাঁ— সর্বত্রই এর অবাধ বিচরণ। কাজের ফাঁকে সাময়িক বিরতি হোক, অপরিচিতের সঙ্গে কথোপকথন শুরু করার মাধ্যম, কিংবা রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মের ব্যস্ততা— সবেতেই এক কাপ চা যেন অপরিহার্য। অনেক ক্ষেত্রে তো তা রীতিমতো ‘বিনামূল্যের থেরাপি’ হিসেবেও কাজ করে।
বিশ্বের দরবারে ভারতীয় চায়ের জয়জয়কার
‘টেস্টঅ্যাটলাস’-এর মে মাসের সংস্করণে ‘বিশ্বের সেরা ১০০ চা’-এর যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে শুধুমাত্র মশলা চা নয়, সগৌরবে জায়গা করে নিয়েছে ভারতের আরও বেশ কয়েকটি চা। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক সেই তালিকা:
মশলা চা: প্রথম
দার্জিলিং চা: ষষ্ঠ
অসম চা: ১৩তম
সুলেমানি চা (কেরল): ৩৯তম
কাংড়া চা (হিমাচল প্রদেশ): ৪১তম
নুন চা (জম্মু ও কাশ্মীর): ৪৩তম
এই তালিকা যেন ভারতের বৈচিত্র্যময় চা-সংস্কৃতিরই এক নিখুঁত আয়না। একদিকে যেমন রয়েছে মশলা চায়ের ঝাঁঝালো আরাম এবং দার্জিলিং চায়ের সূক্ষ্ম সুবাস, তেমনই রয়েছে অসম চায়ের কড়া স্বাদ। বাদ যায়নি কাশ্মীরের সেই বিখ্যাত গোলাপি রঙের ‘নুন চা’ বা ‘গুলাবি চা’-ও, প্রথমবার স্বাদ গ্রহণ করলে যার নোনতা স্বাদ অনেককেই চমকে দেয়।
তালিকায় রয়েছে আর কোন কোন দেশের চা?
এই বৈশ্বিক তালিকায় ভারতীয় চায়ের পাশাপাশি অন্য দেশের পানীয়ও প্রশংসিত হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জাপানের রোস্টেড গ্রিন টি ‘হোজিসা’ (Hojicha)। তৃতীয় স্থানে রয়েছে মসৃণ অথচ কড়া স্বাদের জন্য বিখ্যাত শ্রীলঙ্কার সিলন ব্ল্যাক টি (Ceylon black tea)। চতুর্থ স্থানে রয়েছে জাপানের অত্যন্ত জনপ্রিয় গ্রিন টি ‘সেনচা’ (Sencha) এবং পঞ্চম স্থানে জায়গা করে নিয়েছে চিনের ইউনান প্রদেশের বিখ্যাত ভিনটেজ চা ‘পু-এর’ (Pu erh)।
সম্মানিত দেশীয় চা-বাগানগুলিও
শুধু চায়ের কাপেই এই স্বীকৃতি সীমাবদ্ধ থাকেনি। ওই একই ফুড গাইড বিশ্বের আইকনিক চা ব্র্যান্ড এবং বাগানগুলিরও একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। আর সেখানেও পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের চা-বাগানগুলির বিশ্বজোড়া খ্যাতি ফের একবার প্রমাণিত হয়েছে।
তালিকায় সগৌরবে স্থান পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের কার্শিয়াংয়ের ঐতিহাসিক মকাইবাড়ি (Makaibari) চা-বাগান। ১৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বাগানটি বিশ্বের প্রাচীনতম চা কারখানাগুলির মধ্যে অন্যতম হিসেবে স্বীকৃত। এর পাশাপাশি রয়েছে অসমের ডিব্রুগড়ের হালমারি (Halmari) চা-বাগান। শতাব্দীপ্রাচীন এই বাগান তাদের কড়া স্বাদ ও উন্নতমানের চায়ের জন্য গোটা বিশ্বে পরিচিত।
সব মিলিয়ে, ‘চায়ে পে চর্চা’ ভারতীয়দের কাছে নিছক কোনও শব্দবন্ধ নয়, এটি এক গভীর আবেগ। আর সবচেয়ে সুন্দর বিষয়টি হল, আপনি যদি নিজে চা পান নাও করেন, তবুও চায়ের আড্ডার সেই উষ্ণতায় অনায়াসেই মিশে যেতে পারবেন। কারণ ভারতের সমাজজীবন ও দৈনন্দিন যাপনে চা ঠিক এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।