
৩০ বছর বয়সকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসেবে ধরা হয়। কেরিয়ার, অর্থনৈতিক অবস্থা, ব্যক্তিগত জীবন- সবকিছু ধীরে ধীরে গোছানো হয়ে যায় এই সময়। আবার ৩০ পেরোলে শরীরের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে হার্টের।
হার্টের সমস্যা মানেই ৪০ বা ৫০ বছর বয়সে হঠাৎ শুরু হবে, এমনটা নয়। উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, ধূমপান, মানসিক চাপ এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবের মতো ঝুঁকির কারণ বছরের পর বছর শরীরে তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রথমদিকে কোনও স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয়দের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশিষ্ট চিকিৎসক অজয় ফাদকে জানিয়েছেন, অন্যান্য বেশ কিছু জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় ভারতীয়দের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম বয়সেই হৃদরোগের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় পুরুষদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হার্ট অ্যাটাক ৫০ বছর বয়সের আগেই ঘটে।
উপসর্গের অপেক্ষা নয়, নিজের রিপোর্ট জানুন
শরীর সুস্থ লাগছে মানেই হার্টের ঝুঁকি নেই, এমনটা নয়। চিকিৎসক রজনীশ কাপুরের মতে, ৩০-এর কোঠায় নিয়মিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য-পরিমাপের দিকে নজর দেওয়া উচিত। এর মধ্যে রয়েছে ব্লাড প্রেসার, ব্লাড সুগার এবং কোলেস্টেরল। লিপিড প্রোফাইলের মাধ্যমে মোট কোলেস্টেরল, LDL, HDL এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা জানা যায়।
বিশেষ করে LDL বা খারাপ কোলেস্টেরল বেশি থাকলে ধমনীর ভিতরে প্লাক জমতে পারে। সমস্যা হল, কোলেস্টেরল বেড়ে গেলেও অনেক সময় কোনও উপসর্গ দেখা যায় না।
ব্লাড সুগারের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। ফাস্টিং ব্লাড গ্লুকোজ এবং HbA1c পরীক্ষার মাধ্যমে প্রিডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা আগেভাগে ধরা যেতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল বা অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে উচ্চ ব্লাড সুগার থাকলে হৃদরোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কমান
অফিসের দীর্ঘ সময়ের কাজ, যাতায়াত এবং ডেস্ক জবের কারণে দিনের একটা বড় সময় বসেই কাটে অনেকের। প্রতিদিন কঠিন শরীরচর্চা করতেই হবে এমন নয়। কিন্তু নিয়মিত শরীরকে নড়াচড়ার মধ্যে রাখা জরুরি।
দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, স্ট্রেচিং অথবা কাজের মাঝে ছোট ছোট মুভমেন্ট ব্রেক নেওয়া যেতে পারে। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা ওজন, রক্তচাপ, ব্লাড সুগার এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
প্রতিদিনের খাবারের দিকে নজর দিন
ব্যস্ত জীবনযাত্রায় রাতে দেরি করে খাবার খাওয়া, বাইরের খাবার, প্যাকেটজাত খাবার বা অনিয়মিত খাবার অনেকের অভ্যাস হয়ে যায়। তবে শুধু কোন খাবার বাদ দিতে হবে, সেটির দিকে নজর না দিয়ে প্রতিদিনের খাবারে স্বাস্থ্যকর উপাদান বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
খাবারে সবজি, ফল, ডাল, বাদাম এবং বিভিন্ন ধরনের বীজ রাখা যেতে পারে। বাইরে খাওয়ার সময় ভাজাভুজির বদলে স্টিমড বা গ্রিলড খাবার বেছে নেওয়া, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং খাবারের সঙ্গে সবজি যোগ করা উপকারী হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি, নুন এবং অস্বাস্থ্যকর ফ্যাটযুক্ত খাবার কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
ধূমপান, ঘুম ও স্ট্রেসকে হালকা ভাবে নেবেন না
ধূমপান রক্তনালী ও করোনারি আর্টারির ক্ষতি করতে পারে। শুধু ধূমপান নয়, অন্যের সিগারেটের ধোঁয়ার সংস্পর্শেও হৃদযন্ত্রের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই যারা ধূমপান করেন, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করা উচিত।
হার্টের স্বাস্থ্যের সঙ্গে ঘুমেরও সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত কম ঘুম বা খারাপ ঘুম রক্তচাপ, ব্লাড সুগার এবং শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুমের মধ্যে জোরে নাক ডাকা বা হঠাৎ হাঁসফাঁস করে ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
মানসিক চাপও অবহেলা করা উচিত নয়। জীবনে কিছুটা স্ট্রেস স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকা ভালো নয়। নিয়মিত শরীরচর্চা, কিছুক্ষণ স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা, বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিজের জন্য বিশ্রামের সময় রাখা স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
শুধু কোলেস্টেরল নয়, নজর দিন কিডনির দিকেও
হার্টের স্বাস্থ্য মানেই শুধু কোলেস্টেরল বা ব্লাড সুগার নয়। কিডনির স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ। কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ক্রিটেটিনিন এবং eGFR পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন ও ক্রিয়েটিনিনের অনুপাত পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ বা উচ্চ ব্লাড সুগারের ক্ষেত্রে রক্তনালীর ক্ষতির প্রাথমিক কিছু লক্ষণ ধরা পড়তে পারে।
Lp(a) পরীক্ষার কথাও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হল Lipoprotein(a), বা Lp(a)। এটি মূলত জেনেটিক কারণের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং সাধারণ লিপিড প্রোফাইলের অংশ নয়। ডা. অজয় ফাডকের মতে, গাইডলাইন অনুযায়ী জীবনে অন্তত একবার Lp(a) পরীক্ষা করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
যাদের অল্প বয়সেই LDL কোলেস্টেরল অত্যন্ত বেশি অথবা পরিবারে কম বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে বংশগত হাই কোলেস্টেরল সমস্যার পরীক্ষার কথাও ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন। এই সমস্যা বহু বছর কোনও লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে।
৩০-এর পর হার্ট ভালো রাখতে কী করবেন?
হার্ট সুস্থ রাখার জন্য একদিনে জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই। বরং নিয়মিত কিছু অভ্যাস তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ। শরীরকে সক্রিয় রাখা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান এড়ানো, স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার মাধ্যমে নিজের গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টগুলির দিকে নজর রাখা দরকার।
কোনও একটি রিপোর্ট অস্বাভাবিক হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পুরো স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হৃদরোগের ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর অপেক্ষা করার চেয়ে ঝুঁকি আগেভাগে চিহ্নিত করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।