
বাঙালি মানেই তো ছাঁকা তেলে বেগুনভাজা কিংবা কষিয়ে মাংস রান্না। কিন্তু রসনা তৃপ্তির চক্করে নিজের অজান্তেই কি হার্ট অ্যাটাকের পথ প্রশস্ত করছেন না? মাসে পরিবারে কত লিটার তেল খরচ হওয়া উচিত, স্পষ্ট হিসাব দিলেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ।
তেল ছাড়া ভারতীয় রান্না যেন ভাবাই যায় না। তা ফোড়ন দেওয়া ঝোল-ঝালই হোক কিংবা উইকএন্ডের লুচি-পরোটা, কড়াইয়ে তেল পড়বেই। কিন্তু রান্নার স্বাদ বাড়াতে গিয়ে তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাঁধ না মানলে তার চড়া মাশুল গুনতে হতে পারে হার্টকে। বাজারে কোন তেল পাওয়া যাচ্ছে বা আপনি কী তেল ব্যবহার করছেন— শুধু সেটুকুই যথেষ্ট নয়। সবথেকে বড় প্রশ্ন হল, সারা দিনে আপনার শরীরে ঠিক কতটা তেল যাচ্ছে?
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাত্রার গোলমালেই আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে হৃদরোগীর সংখ্যা। তাই সতর্ক হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
এক দিনে কত টুকু তেল খাওয়া নিরাপদ?
ফরিদাবাদের মারেঙ্গো এশিয়া হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ডিরেক্টর ড. গজিন্দর কুমার গোয়েল জানাচ্ছেন, একজন সুস্থ-সবল মানুষের সারাদিনে ৩ থেকে ৪ চামচ, অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ মিলিলিটারের বেশি তেল খাওয়া একেবারেই উচিত নয়।
সেই হিসাবে:
এক দিনে: ১৫–২০ মিলিলিটার
এক সপ্তাহে: ১০৫–১৪০ মিলিলিটার
এক মাসে: ৫০০–৬০০ মিলিলিটার
অর্থাৎ, চারজনের পরিবারে সারা মাসে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২ লিটার তেল খরচ হওয়া উচিত। কিন্তু অধিকাংশ ভারতীয় পরিবারে চার-পাঁচজনের সংসারে মাসে প্রায় ৫ থেকে ১০ লিটার তেল সাবাড় হয়ে যায়, যা চিকিৎসকদের মতে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ!
কোন তেল স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল?
বাজারে সর্ষে, সূর্যমুখী, সয়াবিন, নারকেল কিংবা অলিভ অয়েল— অপশনের অভাব নেই। ড. গোয়েলের মতে, ভারতীয় রান্নার ক্ষেত্রে ঘানি ছাঁটা সর্ষের তেল কিংবা সূর্যমুখী তেল বেশি উপযোগী।
সর্ষের তেলের ‘স্মোক পয়েন্ট’ (Smoke Point) বেশি হওয়ায় কড়া আঁচে রান্নায় এর পুষ্টিগুণ নষ্ট হয় না। অন্য দিকে, অলিভ অয়েল কম আঁচে রান্না করা খাবার বা স্যালাডের সঙ্গেই উপযুক্ত। অলিভ অয়েলে ছাঁকা তেলে ভাজাপুজি করা একেবারেই অনুচিত।
রিফাইন তেলের বাড়-বাড়ন্তেই কি বিপত্তি?
চিকিৎসকদের বক্তব্য, রিফাইন তেল তৈরির সময়ে অতি উচ্চ তাপমাত্রা ও একাধিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর ফলে তেলের নিজস্ব গুণাগুণ নষ্ট তো হয়ই, পাশাপাশি বেশ কিছু ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হয়। টানা রিফাইন তেল খেলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা বাড়ে, যা পরবর্তীকালে ধমনী অবরুদ্ধ করে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
মেপে না খেলে কী হতে পারে?
মাঝেসাঝে এক-আধবার ছাঁকা তেলে ভাজা খাবার খেলে খুব বড় ক্ষতি হয়তো হবে না। তবে রোজকার খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত তেল থাকলে:
শরীরে মেদ জমতে শুরু করবে ও স্থূলতা দেখা দেবে।
রক্তে শর্করার মাত্রা এবং প্রেশার ওঠানামা করতে পারে।
ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোলেস্টেরল বৃদ্ধি পাবে।
অকাল হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে নিয়ম কতটা কড়া?
যাঁদের ইতিমধ্যেই হৃদরোগের সমস্যা রয়েছে বা একবার স্ট্রোক হয়ে গিয়েছে, তাঁদের আরও কড়া নিয়মে বাঁধতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ, সারা মাসে তাঁদের খাদ্যতালিকায় ৭৫০ মিলিলিটারের বেশি তেল রাখা ভুল হবে। স্বাদের সামঞ্জস্য রাখতে ৮০ শতাংশ সর্ষের তেলের সঙ্গে ২০ শতাংশ ঘি বা মাখন ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে তা-ও হতে হবে অত্যন্ত সীমিত ও মাপা পরিমাণে।
সংক্ষিপ্ত পরামর্শ: রান্নায় তেল ঢালার আগে হাত যেন না পিছলে যায়! কড়াইয়ে সরাসরি তেল না ঢেলে চামচে মেপে ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তোলাই স্বাস্থ্যের জন্য শ্রেয়।