
ভারতে এই মুহূর্তে অন্যতম বড় স্বাস্থ্যজনিত উদ্বেগের বিষয় হল স্থূলতা। যার জেরে হার্টের রোগ, ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা সহ নানা রোগ বাসা বাঁধছে শরীরে। একটা সময় ছিল যখন, নির্দিষ্ট বয়সের পরে বা অনেক ক্ষেত্রে পৌঢ় বয়সে সাধারণত যে ধরনের রোগগুলির ঝুঁকি থাকত, অনেক ক্ষেত্রে বার্ধক্যেও হত, সেই সব রোগ এখন অল্প বয়সেই দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে যুবক, এমনকী কিশোর বয়সেও অনেকের হার্টের রোগ ধরা পড়ছে। ডাক্তাররা এই প্রবণতাকে রুখতে মূলত ওজন কমানো ও লাইফস্টাইল, খাওয়াদাওয়ায় বদলকেই একমাত্র উপায় বলছেন।
India Today HealthWealth Summit 2026-এর মঞ্চে 'বিমারিয়োঁ কা বাপ মোটাপা' শীর্ষক আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন বিখ্যাত চিকিত্সক অনুপ মিশ্র ও ডাক্তার অশোক শেঠ। অনেকেই ওজন মাপার যন্ত্র দেখে দেখে ওজন কমাতে থাকেন। এই প্রবণতাও ঠিক নয় বলেই মত ডাক্তারদের। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর ওজন দরকার। শুধুই কমিয়ে যাওয়া উচিত নয়। চিকিৎসকেরা শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি শনাক্ত করা, কোমরের মাপ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায় এমন বিষয়গুলির দিকে নজর দেওয়ার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান, মদ্যপান, মানসিক চাপ এবং বায়ুদূষণ হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা। কারণ ভারতে ক্রমশ কমবয়সিদের মধ্যেও বাড়ছে হৃদ্রোগের সমস্যা।
হৃদ্রোগের প্রকোপ প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে
নামী ডাক্তার অশোক শেঠের কথায়, 'হার্টের রোগ আর শুধুমাত্র প্রৌঢ় বা বৃদ্ধদেরই হচ্ছে না। যুবক-যুবতীরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। ভারতে এখন যত হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা ঘটে, তার ৫০ শতাংশেরই বয়স ৫০ শতাংশের নীচে।' গত ১৫ বছরে হৃদ্রোগের প্রকোপ প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে বলে আলোচনায় দাবি করা হয়েছে। হৃদ্রোগ অনেক সময় বছরের পর বছর ধরে শরীরে বাসা বাঁধে। প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট কোনও উপসর্গ না-ও দেখা দিতে পারে। তাই গুরুতর জটিলতা তৈরি হওয়ার আগেই উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের অস্বাভাবিক মাত্রা, ডায়াবিটিস এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত করা জরুরি।
শরীরের লুকনো চর্বি বাড়াতে পারে রোগের ঝুঁকি
চিকিৎসক অনুপ মিশ্রের মতে, শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা শুধু সৌন্দর্য বা ওজনের বিষয় নয়। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির চারপাশে চর্বি জমলে বিপাকীয় সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শরীরের এই অদৃশ্য চর্বি বাইরে থেকে দেখে বা ওজন মেপে সব সময় বোঝা সম্ভব নয়। অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির চারপাশে জমে থাকা এই চর্বিকে বলা হয় ‘ভিসেরাল ফ্যাট’। এটি ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে এবং বিপাকীয় রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শুধু চেহারা বা ওজনের উপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
অনুপ মিশ্র আরও জানিয়েছেন, শরীরে পেশি ও চর্বির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। অনেক ভারতীয়কে বাইরে থেকে অতিরিক্ত মোটা না দেখালেও তাঁদের শরীরে চর্বির অনুপাত বেশি এবং পেশির পরিমাণ কম হতে পারে। ফলে শুধু ওজন দিয়ে শরীরের প্রকৃত স্বাস্থ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা পাওয়া যায় না। নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস পেশির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমানোও প্রয়োজন, বিশেষত পেটের আশপাশে চর্বি জমলে।
কোমরের মাপেও মিলতে পারে রোগের ঝুঁকির ইঙ্গিত
পেটের অতিরিক্ত চর্বি বা অ্যাবডোমিনাল ওবেসিটির ঝুঁকি বোঝার একটি সহজ উপায় হল কোমরের মাপ নেওয়া। আলোচনায় পুরুষদের ক্ষেত্রে ৩৬ ইঞ্চি এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৩২ ইঞ্চির বেশি কোমরের মাপকে সতর্কতার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোমরের মাপ বেশি হলে টাইপ-২ ডায়াবিটিস এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে ঝুঁকি নির্ধারণের সময় রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করার মাত্রা, বয়স এবং পারিবারিক রোগের ইতিহাসও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হৃদ্স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণের কথা তুলে ধরেছেন চিকিৎসকেরা। সেগুলি হল অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, মদ্যপান, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, স্থূলতা এবং বায়ুদূষণ। এই কারণগুলি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শুধু ওজন কমানোর চেষ্টা না করে জীবনযাপনের একাধিক অভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি।
দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার এবং হৃদ্স্পন্দন বাড়ায় এমন অন্যান্য ব্যায়াম হৃদ্যন্ত্রের কর্মক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে। সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সপ্তাহে দু’দিন বা তার বেশি পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করা যেতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ ও হৃদ্স্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। অনুপ মিশ্র সাশ্রয়ী রান্নার তেল হিসেবে সরষের তেলের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে কোনও একটি তেল খেলেই হৃদ্রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। খাবারে মোট চর্বির পরিমাণ, কী ধরনের চর্বি খাওয়া হচ্ছে, খাবারের পরিমাণ এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রাতরাশে গোটা শস্য, ডাল, ফল, বাদাম, দুগ্ধজাত খাবার এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ উপাদান রাখা যেতে পারে। তবে ব্যক্তির পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাবারের নির্বাচন করা উচিত।