
ছিল একটানা কাশি। মাঝেমধ্যে শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। যার ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছিল হাঁপানির চিকিৎসা। এই উপসর্গ নিয়েই সেকেন্ড ওপিনিয়নের জন্য বেঙ্গালুরুর পালমোনোলজিস্ট ডা: সচিন কুমারের কাছে গিয়েছিলেন বছর ৫০-এর এক মহিলা। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো আরও একটি ইনহেলারই দেওয়া হবে। কিন্তু একটি সাধারণ চেস্ট এক্স-রে-তেই ধরা পড়ে চমকে দেওয়া তথ্য।
সেখানে দেখা যায়, তাঁর ফুসফুসের চারপাশে তরল জমে রয়েছে। এরপর আরও পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়, তাঁর ফুসফুসে বাসা বেঁধে ক্যান্সার। সেটা অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছে। সেটা প্লুরাতেও পৌঁছে গিয়েছে।
ডা: সচিন কুমার বলেন, 'সব কাশি বা শ্বাসকষ্ট হাঁপানি নয়। এই সব উপসর্গ যদি দীর্ঘদিন থাকে বা চিকিৎসা করানোর পরও না কমে, তাহলে আবার সেদিকে তাকানো জরুরি।'
মাথায় রাখতে হবে, ভারতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যান্সারগুলির মধ্যে একটি ফুসফুসের ক্যান্সার। এক সময় ফুসফুসের ক্যান্সারকে বয়স্ক ধূমপায়ী পুরুষদের রোগ বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখন ক্রমশ বেশি মহিলাদের মধ্যেও এই রোগ তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, কোনও ধূমপান না করেও অনেকেরই এই রোগ হয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হল, বর্তমানে ভারতে ক্যান্সারে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছে ফুসফুসের ক্যান্সার।
কয়েক সপ্তাহ আগে প্রকাশিত Globocan 2024-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে ১,১২,৬৫৯টি নতুন ফুসফুসের ক্যান্সারের কেস রেজিস্টার হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যার বিচারে এটি দেশের তৃতীয় সর্বাধিক ক্যান্সার।
কিন্তু এই রোগে মৃত্যু হয়েছে ৯৮,৬৮৭ জনের। যার ফলে ক্যান্সারে মৃত্যুর নিরিখে এটিকে দেশের প্রথম স্থানে নিয়ে এসেছে।
অর্থাৎ, ২০২৪ সালে দেশে মোট ১৫.৬২ লক্ষ নতুন ক্যানসার রোগীর মধ্যে ৭.২ শতাংশ ছিলেন ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত। অথচ ওই বছর ক্যান্সারের মোট ৯,০১,৮২৮টি মৃত্যুর মধ্যে১০.৯ শতাংশই হয়েছে ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণে।
আর এই তথ্যই প্রমাণ করে দেয় খুব কম ক্যান্সারের ক্ষেত্রেই আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর হার এত বেশি।
ডা: সচিন কুমার বলেন, 'আমাদের হাসপাতালে প্রতি তিন মাসে গড়ে দুই থেকে তিনজন নতুন প্রাইমারি লাং ক্যান্সারের রোগী ধরা পড়ছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই মহিলা অথবা এমন ব্যক্তি, যাঁরা কোনও দিন ধূমপান করেননি।'
নীরবে বাড়ছে বিপদ
পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই দশকে ভারতে ফুসফুসের ক্যান্সারের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
২০০৪ সালে যেখানে বছরে প্রায় ৫৫ হাজার নতুন রোগী ধরা পড়ত, সেখানে ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১,১২,৬৫৯।
বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে এই বৃদ্ধি আরও চোখে পড়ার মতো। ২০০৪ সালে মোট রোগীর প্রায় ২০ শতাংশ ছিলেন মহিলা। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে ৩৩,৬০০-এরও বেশি মহিলা এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
আরও উদ্বেগের বিষয়, এখন আর শুধু ধূমপায়ীদেরই ফুসফুসের ক্যান্সার হয় না, বরং সমস্যা রয়েছে আরও অনেক ক্ষেত্রেই।
ভারতে ধূমপানের ভিত্তিতে জাতীয় পরিসংখ্যান না থাকলেও, বিভিন্ন হাসপাতালের গবেষণায় দেখা গিয়েছে ১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ ফুসফুসের ক্যানসার রোগী কোনও দিন ধূমপান করেননি।
সাকরা ওয়ার্ল্ড হাসপাতালের মেডিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট ডা: বিজয় কুমার শ্রীনিবাসালু জানান, রান্নার ধোঁয়া, বায়ুদূষণ, পরোক্ষ ধূমপান, কর্মক্ষেত্রে ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শ এবং রেডন গ্যাস, সবই ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এর পাশাপাশি EGFR Mutation-এর মতো জিনগত পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষত, যাঁরা ধূমপান করেন না, তাঁদের মধ্যে এই ধরনের জিনগত পরিবর্তন তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
কেন এত প্রাণঘাতী?
ডা: বিজয় বলেন, 'সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই রোগ ধরা পড়ে অনেক দেরিতে। কারণ, প্রথমদিকে হয় কোনও উপসর্গ থাকে না, অথবা থাকলেও তা সাধারণ শ্বাসকষ্টজনিত রোগের মতোই মনে হয়।'
টাটা মেমোরিয়াল সেন্টারের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা: কুমার প্রভাস বলেন, 'ফুসফুসের ক্যান্সার ও যক্ষ্মার অনেক উপসর্গ এক। দীর্ঘদিন কাশি বা বুকের এক্স-রেতে অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে প্রথমে অনেক সময় যক্ষ্মা বলে ধরে নেওয়া হয়। ফলে সঠিক রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়।'
তিনি আরও জানান, ফুসফুসের আকার বড় হওয়ায় টিউমার অনেক সময় দীর্ঘদিন নীরবে বাড়তে পারে।
ফলে রোগ ধরা পড়ার আগেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়। তাই কোনও লক্ষণ থাকলে সতর্ক হতে হবে। নিতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ। নইলে বিপদ বাড়বে বই কমবে না।