
আমাদের দেশে এখনও মাথা ব্যথার অন্যতম কারণ ম্যালেরিয়া। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ এই মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আর আক্রান্তদের মধ্যে একটা বড় অংশের রোগ সেরে ওঠার কিছু মাস বাদে আবার ফিরে আসছে। যার ফলে জটিল দিকে মোড় নিচ্ছে পরিস্থিতি। আর এই সমস্যারই সমাধানে নতুন একটি ওষুধ আসছে। এই ওষুধটি একবার খেলেই ম্যালেরিয়া ফিরে আসার আশঙ্কা কমবে। আর এই ওষুধটার ট্রায়াল চলছে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। সেটা সম্পূর্ণ হলেই ওষুধটা চলে আসবে বলে জানা যাচ্ছে।
এই ওষুধের ট্রায়ালের মুখ্য গবেষক প্রফেসর ডা: অরুণাংশু তালুকদার বলেন, 'ম্যালেরিয়ার পর ক্লোরোকুইন ট্যাবলেট খেলে জ্বর কমে যায়। কিন্তু ভাইভ্যাক্স ম্যালেরিয়ার জীবাণু ডরম্যান্ট ফেজে চুপটি করে লিভারের মধ্যে বাসা বেঁধে থাকে। আপনি যে ক্লোরোকুইন ট্যাবলেট খেয়েছেন, সেটা লিভারের ভেতরের জীবাণুগুলিকে মারতে পারে না। এবার যখন ক্লোরোকুইনের এফেক্ট শেষ হয়ে যায়, সেটা এক মাস হতে পারে, দুই মাস হতে পারে, ছয় মাস হতে পারে, তখন আবার ম্যালেরিয়ার জ্বর আসতে পারে। কারণ, ওই লিভারের ভেতরে যে জীবাণু বসে ছিল, তারা আবার বংশবিস্তার করে ব্লাডে চলে আসতে পারে। এটাকে রিল্যাপ্স বলে।'
ডা: তালুকদার জানালেন, এই সমস্যা সমাধানে ভাইভ্যাক্স ম্যালেরিয়ার রোগীদের ক্লোরোকুইনের পাশাপাশি প্রাইমাকুইন ওষুধটা দেওয়া হয়। এই ওষুধ ১৪ দিন ধরে খেতে হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই জ্বর কমে যাওয়ার পরে ১৪ দিন ধরে প্রাইমাকুইন ট্যাবলেটটা অনেকে খান না। যার ফলে রোগ ফিরে আসে। আর সেই সমস্যার সমাধানেই নতুন ওষুধ আনা হয়েছে। এই ওষুধটার নাম ট্যাফেনোকুইন। এটা একবার খেলেই কাজ হবে। ম্যালেরিয়া ফিরে আশার আশঙ্কা কমবে।
তিনি বলেন, 'এই ট্যাফেনোকুইন হচ্ছে সিঙ্গেল ডোজ। একটা ট্যাবলেট খেলেই যথেষ্ট। এই ওষুধেরই ভারতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হচ্ছে। দেখা হচ্ছে, এখানকার মানুষের শরীরে কেমন করে কাজ করবে ওষুধটি।'
এক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশে আইসিএমআর পুরো ব্যাপারটা মনিটর করছে। ভারতে গুজরাতে, মুম্বই ও কলকাতায় চলছে কাজ। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ট্রায়াল চলছে গত দুই বছর ধরে।
ডা: তালুকদার জানান, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আর মাত্র আটটা পেশেন্ট হলেই ট্রায়ালটা শেষ হবে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই কোটা পূরণ হয়ে যাবে। তারপরে এই ডেটা অ্যানালিসিস করা হবে। এরপর ওষুধটা বানান হতে পারে।
ডা: তালুকদার বলেন, 'সরকারের প্ল্যানিং আছে যে এই ওষুধটা মার্কেটে ছাড়া হবে না। এটা সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে দেওয়া হবে। যাতে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়।'
তবে এই ওষুধ সকলকে দেওয়া যাবে না। তার আগে একটি নির্দিষ্ট এনজাইম টেস্ট করতে হবে। সেটা শরীরে কম থাকলে দেওয়া যাবে না ওষুধটি।
বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: রজত বাসু বলেন, 'ক্লোরোকুইনের সঙ্গে ট্যাফেনোকুইনের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার পর পুনরায় রোগ ফিরে আসা বা রিল্যাপ্স প্রতিরোধে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একজন জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে, এই ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে আমি আশাব্যঞ্জক বলে মনে করি। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে ট্রায়ালের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা জরুরি।'