
‘কনজাংটিভাইটিস’, চোখের এই রোগের কথা কমবেশি আমরা সকলেই শুনেছি । চারপাশের অনেকেই এই অসুখে ভুগেছেন। এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ চোখ লাল হয়ে যাওয়া। এ ছাড়াও যন্ত্রণা, চোখে অস্বস্তি, চোখ থেকে অনবরত জল পড়ার মতো সমস্যা তো রয়েছেই। বড়দের তো হয়েই, এই রোগের হাত থেকে নিস্তার নেই শিশুদেরও। তীব্র গরম, আবার হঠাৎই বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা নেমে যাওয়া। সব মিলিয়ে মরসুম বদলের এই সময়ে জীবাণুরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাসবাহিত অসুখও জাঁকিয়ে বসতে শুরু করে শরীরে। এমন আবহাওয়ায় শুরু হয় কনজাংটিভাইটিসের হানা। মূলত ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়ার কারণে এই অসুখ হলেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে ফুলের রেণু থেকে অ্যালার্জিও এই অসুখের কারণ।
কনজাংটিভাইটিস আসলে কী?
আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে এই রোগটির প্রকোপ ছিল বাড়াবাড়ি রকমের। ফি বছর স্কুল, অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় লাল চোখ নিয়ে ফিরত লোকজন। চলতি ভাষায় এই রোগকে বলা হয় জয় বাংলা। কেউ বলে চোখ ওঠা। চিকিৎসা পরিভাষায় এই সমস্যাকে বলে কনজাংটিভাইটিস। এটি চোখের একরকম সংক্রমণ। এর জন্য দায়ী মূলত অ্যাডিনো ভাইরাস। এছাড়াও বেশ কিছু ব্যাকটেরিয়ার কারণেও হতে পারে এই অসুখ। তাই সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। চোখ লাল হয়ে ফুলে যাওয়া, চোখ দিয়ে জল পড়া, চোখ ব্যথা এসবই হল কনজাংটিভাইটিসের প্রধান কারণ। অনেক সময় ঘুম থেকে উঠে পিচুটির জন্য চোখ খুলতে সমস্যা হয়। কখনও আবার চোখ লাল হয়ে যায়। আবার দেখা যায় চোখ থেকে জল পড়ছে । এই সমস্যা দেখলেই বুঝবেন কনজাংটিভাইটিস হয়েছে। চোখের সাদা অংশে একটি ঝিল্লি থাকে। একে কনজাংটিভা বলে। অ্যাডেনো ভাইরাস, হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস-সহ আরও অনেক ভাইরাস চোখের ঝিল্লিতে সংক্রমিত হয়। যার কারণে কনজাংটিভা ফুলে যায়
খুব সাবধানে থাকা উচিত
কনজাংটিভাইটিস হলে খুব সাবধানে থাকা উচিত। চোখ চুলকোলেও বার বার হাত দেওয়া উচিত নয়। হাত পরিষ্কার রাখতে হবে। চোখে কোনও কাপড় দেওয়া চলবে না। যত বেশি চোখ চুলকোবেন ততই বেশি সমস্যা। সেই সঙ্গে আলোতে বিশেষ না বেরনোই ভাল। এক সপ্তাহ লাগে পুরোপুরি এই সংক্রমণ দূর করতে। বাইরে বেরোলে অবশ্যই চোখে রোদ চশমা রাখা উচিত। সেইসঙ্গে এই সময় মোবাইল এড়িয়ে চলুন। ল্যাপটপে কাজ করতে হলে বিশ্রম নিয়ে করুন। একদৃষ্টিতে ল্যাপটপের দিকে দেখবেন না। নিয়ম ঠিকমতো না মানলে সমস্যা পুরোপুরি মিটতে দুই থেকে তিন মাসও লাগতে পারে।
ছোঁয়াচে অসুখ
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রথমে এক চোখে সমস্যা শুরু হয়। পরে অন্য চোখকেও আক্রমণ করে। কারও কনজাংটিভাইটিস হলেই আমরা ধরে নিই, যে হেতু এই অসুখ ছোঁয়াচে, তাই তার দিকে তাকালেই আমাদেরও তা হবে। চিকিৎসকদের মতে, এ অসুখ ছোঁয়াচে ঠিকই, একচোখে হলে আরেক চোখে হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। বাড়ির লোকেরাও আক্রান্ত হতে পারে। তবে তখনই হবে, যদি রোগীর চোখের কোনও রকম সংস্পর্শে কেউ আসেন। যেমন রোগী নিজের চোখে হাত দিয়ে তার পর হয়তো কিছু একটা ধরলেন, সে জিনিস তার পর আপনিও ধরলেন, আর সে হাত চলে গেল চোখে। তখনই এই অসুখ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
কী করবেন?
কনজাংটিভাইটিস হলেই পরিষ্কার জল দিয়ে চোখ ধুতে হবে বার বার। ব্যবহৃত রুমাল-গামছা আলাদা করতে হবে। দরকারে আক্রান্ত ব্যক্তি আলাদা ঘরে থাকবেন। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চোখের সমস্যা বাড়লে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডায়াবেটিস বা হাই ব্লাড প্রেসারের সমস্যা থাকলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসককে বলতে হবে রোগের সমস্যার কথা। সেই অনুযায়ী সলিউশন বা মলম ব্যবহার করতে হবে। এই রোগ থেকে বাঁচতে বেশি করে চোখে জলের ঝাপটা দিতে হবে। হাত বারবার ধুয়ে নিতে হবে।
সতর্কতা জরুরি
এই রোগ খুবই সংক্রামক। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। ফলে রোগ থেকে বাঁচতে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা প্রয়োজন। নোংরা হাতে চোখ ঘষা, অন্যের তোয়ালে, রুমাল বা অন্য জিনিস ব্যবহার করলে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। এই অবস্থায় পরিবারের নিরাপত্তার জন্য সতর্ক থাকতে হবে। বাড়িতে কারও সংক্রমণ হয়ে থাকলে তাঁর থেকে নিরাপদ দূরত্ব রখতে হবে। হাত না ধুয়ে চোখ স্পর্শ করা যাবে না। খুব ভিড়ের মধ্যে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফল ও সবজি খেতে হবে। সঙ্গে রাখতে হবে ভিটামিন বি-২ এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার।