
ভারতীয় খাবারে প্রাণ সঞ্চার করে থাকে তেল ও মশলা। এই দুই জিনিসই খাবারকে সুস্বাদু করে তোলে। সবজি হোক বা মাছ-মাংসের পদ, তা তেল দিয়েই তৈরি করা হয়। ভারতীয়দের হেঁশেলে সাদা তেল ও সর্ষের তেলের কদরই সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য কোন তেল ভাল, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। আসুন জেনে নিন, খাবার তৈরির ক্ষেত্রে কোন ভোজ্য তেল সবচেয়ে ভাল।
সাধারণত বাড়িতে তেলের ব্যবগার দুভাবে হয়। চিকেন-মাটন কিংবা সবজির কোনও মশলাদার পদের জন্য সর্ষের তেলের ব্যবহার, পরোটা-লুচি ভাজার জন্য সাদা তেলের ব্যবহার করা হয়। অনেকে আবার যখন তেল ফুরিয়ে যাওয়ার মুখে আসে, এই দুই তেল মিশিয়েও রান্না করেন। কিন্তু এই দুই তেল মিশিয়ে রান্না করা কতটা নিরাপদ, সেই বিষয়ে টিপস দিলেন ফর্টিস হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ প্রশান্ত পাওয়ার।
ভুল তেল রোগের কারণ হতে পারে
ডাঃ প্রশান্ত পাওয়ার জানিয়েছেন যে রান্নার তেল শুধু স্বাদের ওপর নির্ভর করে না, এর পুষ্টিগুণ ও স্মোকি পয়েন্টের ওপর নির্ভর করে কেনা উচিত। সঠিক তেল হৃদযন্ত্রকে ভাল রাখে, যেখানে ভুল তেল শরীরে খারাপ ফ্যাটকে বাড়িয়ে একাধিক অসুস্থতার কারণ হতে পারে।
তেল মিশিয়ে খাওয়া উচিত?
ডাঃ পাওয়ার এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, আলাদা আলাদা তেল মিশিয়ে ব্যবহার করা সাধারণভাবে সুরক্ষিত বলে মানা হয়ে থাকে। একে ব্লেডিং অয়েল বলা হয়। অনেকেই সর্ষে, সয়াবিন বা অন্যান্য তেল দিয়ে রান্না করেন খাবারের স্বাদ বাড়াতে এবং আলাদা আলাদা খনিজ পদার্থ যাতে পাওয়া যায়। তেল মিশিয়ে রান্না করলে সেই খাবারে বিশেষ স্বাদ যেমন পাওয়া যায় তেমনি পুষ্টিও ভাল মেলে। তবে তেল মিশিয়ে রান্নার জন্য এটা মনে রাখতে হবে যে প্রত্যেক তেলের স্মোক পয়েন্ট আলাদা হয়। তাই তেলকে যদি বেশি গরম করা যায়, তাহলে তা ভাঙতে পারে এবং এতে ক্ষতিকারক যৌগ তৈরি হয়। এটি কেবল তেলের পুষ্টিগুণ হ্রাস করে না বরং শরীরের জন্য ক্ষতিকারক পদার্থও তৈরি করতে পারে। তাই কেউ যদি, তেল মিশিয়ে ব্যবহার করেন, তবে তার উচিত খাবারটি কোন তাপমাত্রায় রান্না করা হচ্ছে এবং তেলের গুণমান কী তা মনে রেখে।
সর্ষের তেলের সঙ্গে সাদা তেল মেশানো
ডঃ পাওয়ার বলেন, সাধারণত, স্বাদ এবং চর্বির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সর্ষের তেলের সঙ্গে পরিশোধিত তেল মেশানো হয়, কিন্তু তা এটিকে কম স্বাস্থ্যকর করে তোলে। উপরন্তু, দুটো তেল মেশানোর ফলে এর স্মোকি পয়েন্ট বদলে যায় এবং তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যদিও তেল মিশিয়ে ব্যবহার করা খুব একটা ভুল নয়, তবে এ জন্য সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল ই তেল যেন খুব বেশি গরম না করা হয় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। এরকমভাবে ব্যবহারে এই মিশ্রিত তেল দিয়ে রান্না করলে স্বাদ খারাপ হয় না এবং আমাদের শরীরের পক্ষেও তা সুরক্ষিত।
কোন তেল ব্যবহার করা উচিত
ভারতীয়দের রান্নাঘরে সর্বাধিক ব্যবহৃত তেলগুলির মধ্যে সর্ষে এবং সয়াবিন তেল অন্যতম। উভয় তেলেই পুষ্টিগুণ থাকে, তবে সর্ষের তেলকে বিভিন্ন দিক থেকে বেশি উপকারী বলে মনে করা হয়। ডাঃ প্রশান্ত পাওয়ারের মতে, সর্ষের তেলে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। এই ফ্যাটগুলি হৃদপিণ্ডের জন্য ভালো বলে মনে করা হয় এবং কোলেস্টেরলের ভারসাম্য বজায় রাখতেও সাহায্য করে। সর্ষের তেলের স্মোকি পয়েন্টও উচ্চ, যা প্রায় ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। তাই এই কারণেই এটি ভারতীয় ধাঁচের রান্নার জন্য আদর্শ, যেমন তড়কা, ভাজা বা সবজি রান্না। সর্ষের তেল একটি স্বতন্ত্র স্বাদও প্রদান করে যা ভারতীয় খাবারের সঙ্গে ভালভাবে মিশে যায়।
হৃদযন্ত্রের জন্য কোন তেল উপকারী
জীবনযাত্রার পরিবর্তন আমাদের খাদ্যাভ্যাসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে, যা আমাদের স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমরা যে রান্নার তেল ব্যবহার করি তা আমাদের হৃদরোগের স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। অতএব, রান্নার তেল নির্বাচন করার সময় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ডাঃ প্রশান্ত হৃদরোগীদের জন্য সেরা রান্নার তেল নির্বাচন করার ওপর জোর দেন।
-পরিশোধিত তেল এড়িয়ে চলা উচিত কারণ এটি উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়ে যায়, যা এর গুণমান নষ্ট করে এবং এতে বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হয়।
-সর্ষের তেল এ ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে, কারণ এতে মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে, এটি আরও স্থিতিশীল এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
-কুসুম তেল (Safflower Oil)-এর স্বাদ নিরপেক্ষ হয় আর এতে অ্যানস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি থাকে। তিলের তেলে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সিসামল থাকে।
-এক্স্ট্রা ভার্জিন অলিভ ওয়েল অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের একটি ভালো উৎস, তবে স্মোকিং পয়েন্ট কম, তাই এটি ভারতীয় রান্নায় ব্যবহার করা যাবে না; এটি ড্রেসিংয়ের জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যবহার করা হয়।