
মাতৃগর্ভে একটি ছোট্ট প্রাণের তিল তিল করে বেড়ে ওঠার সফরটি সত্যিই বিস্ময়কর। দীর্ঘ ৯ মাস এক নিরাপদ আশ্রয়ে একটু একটু করে সম্পূর্ণ মানুষের রূপ নেয় সে। গর্ভাবস্থার এই পুরো সময়টা জুড়েই জড়িয়ে থাকে নানা রহস্য। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়টি হল— একজন সাধারণ মানুষ যেখানে জলের নিচে কয়েক মিনিটও শ্বাস না নিয়ে বাঁচতে পারে না, সেখানে মাতৃ জঠরে অ্যামনিওটিক ফ্লুইড বা তরলের মধ্যে ডুবে থেকেও ভ্রূণ কীভাবে দিনের পর দিন বেঁচে থাকে? আপনার মনেও যদি এই প্রশ্ন উঁকি দিয়ে থাকে, তবে এই প্রতিবেদনটি আপনার জন্যই।
প্ল্যাসেন্টা ও আম্বিলিকাল কর্ডের জাদুকরী ভূমিকা
মাতৃগর্ভে শিশুর শ্বাস নেওয়ার পদ্ধতিটি আমাদের স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসের চেয়ে একেবারেই আলাদা। সেখানে শ্বাস নেওয়ার জন্য শিশুকে তার ফুসফুস ব্যবহার করতেই হয় না! চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গর্ভস্থ শিশুর শরীরে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার পুরো দায়িত্বটাই পালন করে মায়ের শরীর।
গর্ভাবস্থায় মায়ের জরায়ুতে 'প্ল্যাসেন্টা' বা অমরা নামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তৈরি হয়। এটি 'আম্বিলিকাল কর্ড' বা নাড়ির মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত থাকে শিশুর সঙ্গে। মা যখনই শ্বাস নেন, তখন তাঁর রক্তে থাকা অক্সিজেন প্ল্যাসেন্টা ও নাড়ির মাধ্যমে সোজা পৌঁছে যায় শিশুর রক্তপ্রবাহে। একইভাবে, শিশু যে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে, তা-ও একই পথ ধরে মায়ের রক্তে ফিরে আসে এবং মা যখন নিশ্বাস ছাড়েন, তখন তা শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।
গর্ভে কি শিশুর ফুসফুস আদৌ কাজ করে?
অবাক করা বিষয় হল, মাতৃগর্ভে শিশুর ফুসফুস পুরোপুরি সক্রিয় থাকে না। ফুসফুস তখন বাতাসে নয়, বরং 'অ্যামনিওটিক ফ্লুইড' নামক এক ধরনের তরলে ভর্তি থাকে। স্বাস্থ্য বিষয়ক পত্রিকা 'মেডিক্যাল নিউজ টুডে'-র মতে, গর্ভাবস্থার ১০ বা ১২ সপ্তাহ থেকেই শিশু গর্ভের ভেতর শ্বাস নেওয়ার মহড়া শুরু করে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় সে বাতাসের বদলে ওই অ্যামনিওটিক ফ্লুইডকেই ভেতরে টানে এবং বাইরে ছাড়ে।
যদিও এই তরল থেকে শিশু কোনও অক্সিজেন পায় না, তবে এর ফলে তার ফুসফুসের পেশি ও ডায়াফ্রামের গঠন এবং বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। মাতৃজঠরের এই অনুশীলনই তাকে জন্মের পর বাইরের পৃথিবীর বাতাসে শ্বাস নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
প্রথম শ্বাস কবে নেয় শিশু?
জন্মের পর শিশু যখন প্রথমবার কেঁদে ওঠে, ঠিক তখনই শুরু হয় তার জীবনের আসল শ্বাস প্রশ্বাস। প্রসবের সময় মায়ের জরায়ুর সংকোচনের ফলে শিশুর ফুসফুসে জমে থাকা তরল আপনা থেকেই বেরিয়ে যায়।
বাইরের পৃথিবীর তাপমাত্রা এবং বাতাসের সংস্পর্শে আসা মাত্রই শিশুর ফুসফুস প্রথমবারের জন্য বাতাসে ফুলে ওঠে। এরপর নাড়ি বা আম্বিলিকাল কর্ডটি কেটে দেওয়া হয় এবং শিশু সম্পূর্ণভাবে নিজের ফুসফুসের ওপর নির্ভর করে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে শুরু করে।